যানজটের শহর হিসাবে বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করিয়াছে ঢাকা শহর। পাশাপাশি সময় অপচয় ও ট্রাফিক অদক্ষতা সূচকেও শীর্ষে রহিয়াছে ঢাকা। বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নামবিও’র ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স ২০১৯-এ ঢাকা এই তালিকার শীর্ষস্থান দখল করিয়াছে। ইতঃপূর্বে ২০১৮ এবং ২০১৭ সালে যানজটে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ২০১৬ সালে ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয় এবং ২০১৫ সালে ছিল অষ্টম। অর্থাত্ ধীরে ধীরে ঢাকা শীর্ষস্থানের দিকে আগাইয়া গিয়াছে। নামবিও’র তালিকায় দেখা গিয়াছে, যানজটের দিক হইতে দ্বিতীয় অবস্থানে রহিয়াছে ভারতের কলকাতা এবং তৃতীয় অবস্থানে রহিয়াছে নয়াদিল্লি। অন্যদিকে ২০১৯ সালেও বিশ্বের সর্বাপেক্ষা কম যানজটপূর্ণ শহরের মধ্যে গতবারের শীর্ষস্থান ধরিয়া রাখিয়াছে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা। দেখা যাইতেছে, একটি শহরের ট্রাফিকব্যবস্থা আর বসবাসযোগ্যতা সমানুপাতিক এক ব্যাপার। ভিয়েনা কেবল সকলের চাইতে কম যানজটপূর্ণ শহরই নহে, বত্সর বত্সর শ্রেষ্ঠ বসবাসের উপযোগী শহর হিসাবে শীর্ষস্থান গ্রহণ করিতেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের চিত্র ইহার ঠিক বিপরীত। যানজটের ক্ষেত্রে যে ঢাকার অবস্থা কতটা বিশৃঙ্খলাপূর্ণ নগরবাসীগণ প্রতিদিনই পলে পলে তাহা অনুভব করিতেছেন। অতএব, এই শহরে সময়ের অপচয় যে তুলনামূলকভাবে বেশি হইবে তাহা বলাই বাহুল্য। অন্যদিকে ট্রাফিক অদক্ষতার কারণেই যে যানজটের শোচনীয় পরিস্থিতি, তাহারও কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় না। পাশাপাশি ইহাও বিবেচনায় লইতে হইবে যে, ঢাকা অত্যন্ত জনবহুল একটি নগর এবং বিশৃঙ্খলা এখানে সর্বব্যাপী। এই শহরে চালকেরা যেমন যত্রতত্র গাড়ি থামাইয়া ফেলে, তেমনি পথচারীরাও সিগন্যালের তোয়াক্কা না করিয়া রাস্তা পারাপার হইতে চাহে। মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার জন্য অনেকখানি দায়ী।
একসময় থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক জ্যামের শহর বলিয়া পরিচিত ছিল। তাহাদের স্কাই ট্রেন এবং জলপথ অনেকখানি যানজট কমাইয়া দিয়াছে। মেট্রো রেল চালু হইলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হইবে এমন আশা করা যায়। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজও শুরু হইয়াছে। কিন্তু আপাতত সেই নির্মাণকার্য়ের জন্যই রাস্তাঘাট সংকীর্ণ হইয়া গিয়া যানজট বৃদ্ধি পাইয়াছে। যেকোনো বড় শহরে ট্রেনই সর্বাধিক মানুষকে পরিবহন করিয়া থাকে, উত্কৃষ্ট উদাহরণ হইল মুম্বাই। যেকোনো উন্নত বৃহত্ নগরে ‘সেন্ট্রাল’ একটি ধারণা, যেটি আন্ডারগ্রাউন্ড ওভারগ্রাউন্ড মিলিয়া বহুমুখী রেলের মিলনকেন্দ্র। সেন্ট্রাল বাসের জন্যও টার্মিনাল বটে, কিন্তু রেলের ব্যাপ্তিতে সেই টার্মিনালকে ক্ষুদ্র দেখায়। অথচ ঢাকা শহরের ভিতরে রেলওয়ের কোনো সম্প্রসারণ হয় নাই, আমাদের অপেক্ষা করিতে হইতেছে সর্বাধুনিক মেট্রো রেলের জন্য। আমাদের সনাতনী রেল লইয়া আরো অনেক কিছু করিবার সুযোগ রহিয়াছে। লন্ডনে যেমন আন্ডারগ্রাউন্ড টিউব রহিয়াছে, তেমনি ওভারগ্রাউন্ড রেলও খুব ব্যবহূত হইয়া থাকে। কুয়ালালামপুরে রেলই রহিয়াছে তিন প্রকারের। ইহা ছাড়া ঢাকাকে যেইরূপ চারটি নদী ঘিরিয়া রহিয়াছে, একটি উন্নত ও সাশ্রয়ী জলপথ ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে পারিলে বহু মানুষ জলযানে পারাপার হইতে পারিতেন। ইদানীং আমাদের সরকার নানান পরিকল্পনা গ্রহণ করিতেছে, কিন্তু ইতোমধ্যে যথেষ্ট বিলম্ব হইয়া গিয়াছে, এইসব পরিকল্পনা বহু পূর্বে লইবার প্রয়োজন ছিল। একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হইতে না হইতেই লক্ষ-কোটি লোক শহরে যুক্ত হইতেছে, ফলে আগের ব্যবস্থাটি অপ্রতুল মনে হইতেছে।
সনাতনী ও আধুনিক পদ্ধতির রেলব্যবস্থায় আমাদের মনোযোগী হইতে হইবে এবং পুরা রেলব্যবস্থাকে একটি ‘সেন্ট্রাল’-এ কেন্দ্রীভূত করিতে হইবে। পাশাপাশি জলপথগুলিকে কাজে লাগাইতে হইবে। সড়কপথ লইয়া নিরীক্ষা করিয়া লাভবান হইবার সুযোগ কম। ক্রমশ রিকশা নামক ঐতিহ্যবাহী যানটির চলাচল অধিক সীমিত করিতে হইবে। কারণ ট্রাফিকের শ্লথগতির জন্য অযান্ত্রিক বাহনগুলিও অনেকখানি দায়ী।
