নদী বাঁচলে আমরা বাঁচবো

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৬

সুজলা-সুফলা শস্য শ্যামল এই দেশকে বলা হয় নদী-মাতৃক দেশ। এ দেশে মানুষের সঙ্গে নদীর গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। গ্রাম থেকে শহরের কূল ঘেঁষে বয়ে গেছে অসংখ্য নদ-নদী। বর্ষাকালে নদীর কল কল শব্দে গ্রামের মানুষের ঘুম ভেঙে যায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নদী অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ আমাদের দেশে ছোট-বড়সহ মোট ২৩০টি নদী আছে। কোনো কোনো পরিসংখ্যানে শাখা-প্রশাখাসহ নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ৮০০টি। আর বাংলাদেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ৫৭টি নদী।  জলরাশি প্রায় ২৪১৪০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে আছে নদ-নদী।

পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে রাজশাহী শহর  যা পর্যটন শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। পদ্মা পাড়ের মানুষ পদ্মাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখে নতুন করে বাঁচার। তারা মাছ ধরে, পদ্মার চরে ফসল ফলায় যা তাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ হতে হাজারও পর্যটক আসছে। যা পদ্মার মানুষের গ্রাম্য এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শুধুই পদ্মা নয়, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি শহর নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের পর্যটন হোটেল-মোটেল ইত্যাদি। যা অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় সহায়ক।

আজকাল আধুনিক যুগে নদীকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে নৌপথ। যাতায়াত ও মালামাল পরিবহন ক্ষেত্রে নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৌপথের কারণে সাশ্রয়ী মূল্যে মালামাল বহন করা যায়। যা আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এখনও দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অভ্যন্তরীণ নৌপথ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। এক পরিসংখ্যান হতে  জানা যায় যে,  নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিটন মালামাল প্রতি কিলোমিটার ব্যয় হয় মাত্র ০.৯০ টাকা। যেখানে রেলপথে ২.০০ টাকা এবং সড়কপথে ২.২০টাকা ব্যয়। আবার নৌ-পথে মালামাল পরিবহনে প্রতি লিটার জ্বালানিতে অতিক্রম করে ২১৭ কিলোমিটার। একই সঙ্গে সড়কপথে মাত্র ২৫ কি.মি. এবং রেলপথে ৮৫ কি.মি.।

আজ বাংলাদেশে অনেক নদ-নদী মৃত্যু উপত্যকায়। আর কয়েক বছর পর ২৫টিরও অধিক নদী তার অস্তিত্ব হারাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। অনেক নদী আজ প্রভাবশালীদের দখলে। তবে ইতিবাচক খবর হচ্ছে-বর্তমান সরকার এরই মধ্যে নদীকে দখলমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে এবং তার কাজ দৃশ্যমান। বুড়িগঙ্গাসহ অনেক নদী দখলমুক্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। আবার অনেক নদী খননের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত নদীর পানিকে দূষণমুক্ত করার জন্য খুব বেশি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। যার ফলে নদী তার স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য হারাচ্ছে।

নদী মানুষের মাছের চাহিদা পূরণের জন্য অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করে। নদীর পাড়ের মানুষ আজও মাছ ধরে জীবন নির্বাহ করে। নদী প্রায় ৭০% মাছের চাহিদা মেটায়। কৃষিখাত বাংলাদেশ অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের চাষাবাদ ব্যবস্থা অনেকটাই নদীর সেচের উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে অনেক নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এক্ষেত্রে নদী খননের কোনো বিকল্প নেই। আবার বিদ্যুত্ উত্পাদন করার ক্ষেত্রে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে একমাত্র জলবিদ্যুত্ কেন্দ্র কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত যা কাপ্তাই বিদ্যুত্ কেন্দ্র নামে পরিচিতি। ১৯৬২ সালে স্থাপিত এই বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ৫ ইউনিটের মাধ্যমে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে সক্ষম।

সুতরাং প্রায় সব ক্ষেত্রে নদ-নদী কোনো না কোনোভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। আমাদের সবারই উচিত নদীকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার না করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া