শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নতুন ফেরি কেনা নয়, মেরামতেই ঝোঁক

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২১, ০৯:২৯

বহরে নতুন ফেরি সংযোজনের চেয়ে পুরাতন ফেরি মেরামত করে চালানোর পক্ষেই ঝোঁক বেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কারণ হিসাবে জানা যায়, রক্ষণাবেক্ষণ বা মেরামত খাতের ব্যয়ের কোন নির্ধারিত সীমা নেই।

আর এ কারণেই মেরামতে উত্সাহ বেশি সংশ্লিষ্টদের। বছরে একেকটি ফেরি মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয় কমবেশি ৩০ কোটি টাকার মতো। তবে এ বিষয়ে সরকারি তরফে কোন তথ্য দেওয়া হয় না। নানা সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কাজে যারা সংশ্লিষ্ট তারাও বলেছেন, এখন ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকায় একটি নতুন ফেরি কিনতে পাওয়া যায়। কিন্তু অজানা কারণে মেরামতেই বেশি উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়।

দেশের নৌপথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে এখনো অন্তত ১০টি রুটে ফেরির ওপরই ভরসা করতে হয় যানবাহন ও যাত্রীদের। কিন্তু বর্তমান এসব পথে চলাচলকারী ফেরিগুলোর চলাচল উপযোগিতা (ফিটনেস) এতটাই নাজুক যে জীবন হাতের মুঠোয় করে ফেরিতে উঠতে হয়। শুধু তাই নয়, কোন একটি নৌযান দুর্ঘটনায় পতিত হলেও তা উদ্ধার করতে সক্ষম কার্যকর কোন উদ্ধারকারী জাহাজ নেই। যে চারটি উদ্ধারকারী জাহাজ রয়েছে সেগুলোর সক্ষমতা সবমিলিয়ে ৬০০ টন। অথচ চলাচলকারী ফেরিগুলোর ওজন ৬০০ থেকে ১৫০০ মেট্রিক টন পর্যন্ত। এরমধ্যে আবার দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ সব জায়গায় চলাচল করতে পারে না।

সর্বশেষ গত বুধবার ১৭টি যানবাহন নিয়ে শাহ আমানত ফেরিটি পাটুরিয়া ঘাটে ডুবে যায়। যাত্রীবাহী কোন পরিবহন ওই ফেরিতে ছিল না। ডুবে যাওয়া অধিকাংশ যানবাহন উদ্ধার হলেও এখন পর্যন্ত ফেরিটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। এখন সেখানে পাঠানো হয়েছে রুস্তুম নামের আরেক উদ্ধারকারী জাহাজ; যা ৬০ টন পর্যন্ত ভারী নৌযান টেনে তুলতে পারে।

কিন্তু শাহ আমানতকে টেনে তুলতে পারবে কি না সেটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৯৭৬ সালের আইন অনুযায়ী ৪০ বছরের বেশি পুরনো নৌযান পরিত্যক্ত ঘোষণার কথা থাকলেও শাহ আমানত ফেরিটি ৪২ বছরের পুরনো।

সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার শিকার এই ফেরিটি ডেনমার্কের তৈরি। ডোনেশনের মাধ্যমে আটটি ফেরি পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে এটি অন্যতম। এ ফেরিগুলো বেশ শক্তিশালী। তাছাড়া ৩০ বছর রি-ইঞ্জিনিয়ারিং করে পরে আবার ১০ বছরের জন্য ফিটনেস নেওয়া হয়েছে। এদিকে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের জনবল সংকটের কারণে ফেরি সার্ভে নিয়মিত হয় না বলে জানা গেছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, ফেরি চালু বা বন্ধ রাখার কোনো ক্ষমতা তাদের নেই।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান এমডি তাজুল ইসলাম জানান, ১২টি নতুন ফেরি অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এগুলোর কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে এসব ফেরি হস্তান্তর হবে। তখন পুরনো ফেরির পরিবর্তে এসব নতুন ফেরি সংযোজন করা হবে।

প্রসঙ্গত, পদ্মা সেতুর পিলারে গত ২০ জুলাই রো রো ফেরি শাহ মখদুম ধাক্কা দেয়। বিআইডব্লিউটিসি সূত্র ও নথিপত্র অনুযায়ী, এ ফেরিটি তৈরি হয় ১৯৮৫ সালে। এর হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই। ২৩ জুলাই পদ্মা সেতুর পিলারে ধাক্কা দেয় রো রো ফেরি শাহজালাল। এ ফেরিটিও ১৯৮০ সালে তৈরি। ফলে আইন অনুযায়ী, এর সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। শাহজালালের হালনাগাদ ফিটনেস সনদও নেই। বিআইডব্লিউটিসি জানায়, পদ্মা সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কার পর পুরনো ছয়টি ডাম্প ফেরি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া যেসব ফেরি ঝুঁকিপূর্ণ সে গুলোর চলাচল আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরিণ নৌ-চলাচল কর্তৃপক্ষের সূত্র মতে, গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশের ১০টি নৌপথে চলাচলকারী ৫৩টি ফেরির ৪৫টির বার্ষিক চলাচল সক্ষমতার সনদ নেই। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ২৩টি ফেরির ফিটনেস সনদ দিয়েছে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর-এমন অভিযোগ রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের মতে নিয়ম মেনেই সব কাজ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী ৩০ বছর পর্যন্ত একটি ফেরির ফিটনেস থাকে। এরপর এসব ফেরি মেরামতের পর চলাচল করে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মীর তারিক আলী বলেন, নৌপথে যান চলাচলের ক্ষেত্রে একটা বিধি রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির সে বিধি অনুযায়ী চলার কথা। তাদের ফেরিগুলোকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে এবং নিয়মিত সার্ভে করতে হবে। এসব নৌযানের যে সময়সীমা তা পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে এর চেয়ে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাবে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিগত ১০ বছরে দেশে ২৬টি নতুন ফেরি কেনা হয়েছে। এরপর আর কোন ফেরি কেনা হয়নি।

 

ইত্তেফাক/এমআর/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন