কুমিল্লা নগরীর নানুয়া দীঘির উত্তর পাড়ের একটি অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে হামলা, ভাঙচুর ও সহিংসতার ঘটনায় কোতোয়ালি ও সদর দক্ষিণ মডেল থানাসহ জেলার চার থানায় এ পর্যন্ত মোট ১২টি দায়ের হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে পাঁচটি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
এর মধ্যে পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তভার পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এক আদেশে গত ২৪ অক্টোবর সিআইডির নিকট হস্তান্তর করা হয়। এরপর গত রবিবার (৩১ অক্টোবর) দুইটি এবং সোমবার (১ নভেম্বর) আরও দুইটি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। মঙ্গলবার (২ নভেম্বর) কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি-কুমিল্লা কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নানুয়া দীঘির পাড়ের অস্থায়ী পূজামণ্ডপে গত ১৩ অক্টোবর ভোরে প্রতিমার মধ্যে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের এসআই মো. হারুনুর রশিদ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা ও কোরআন অবমাননার অপরাধে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত চারজনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করে। এরপর গত ২১ অক্টোবর রাতে কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে ইকবাল হোসেনকে আটক করা হয়।
এর আগে ৯৯৯ নম্বরে কল করা রেজাউল ইসলাম ইকরাম, নগরীর দারোগাবাড়ি মসজিদ ও শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (রহ.) মাজারের সহকারী খাদেম মো. হুমায়ুন কবীর ও আশিকুর রহমান মোহাম্মদ ফয়সলকে আটক করা হয়। এ চারজনকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় এবং ২২ অক্টোবর তাদেরকে আদালতে তোলা হলে পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের প্রথম দফা সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। এরই মধ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে ২৪ অক্টোবর এ মামলাটি সিআইডিকে তদন্তের আদেশ হয়। ২৬ অক্টোবর সিআইডি এ মামলার যাবতীয় নথিপত্র বুঝে পায় এবং ৫ সদস্যের কমিটি করে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে সিআইডি। ২৯ অক্টোবর সিআইডি আসামিদের অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দ্বিতীয় দফায় আরও পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়।
এদিকে পূজামণ্ডপের অপ্রীতিকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোলাম মাওলা নামের এক যুবক ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে বিভিন্ন উগ্রবাদী মন্তব্য সংযুক্ত করে প্রচার করে। এ ঘটনায় র্যাব ১৪ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করে এবং ১৫ অক্টোবর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা হয়। এ ছাড়া গত ২৫ অক্টোবর নানুয়া দীঘির পাড়ের বাসিন্দা তরুণ কান্তি মোদকের দায়ের করা বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলাও তদন্ত করছে সিআইডি। এ মামলায় অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
১৩ অক্টোবর নগরীর কাপড়িয়াপট্টি চানমনী কালীবাড়ি মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করে মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পুরোহিত ও দর্শনার্থীদের মারধরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৩২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে। এ মামলায় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোশারফ হোসেনকে আসামি করা হয়। এ মামলাটিরও তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে।
এছাড়া ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার ঘোষগাঁও এলাকায় পূজামণ্ডপে ককটেল বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনায় সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই ফেরদৌস হোসেন বাদী হয়ে ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ৭০ থেকে ৮০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ মামলাও তদন্ত করছে সিআইডি।
সর্বশেষ নানুয়া দীঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে সহিংসতার ঘটনা ‘কুমিল্লা টাইমস’ নামের একটি নিউজ পোর্টালে লাইভে প্রচার করে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার অভিযোগে ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্টে সোমবার (১ নভেম্বর) কোতোয়ালি মডেল থানায় আরো একটি মামলা হয়েছে। সিআইডি-কুমিল্লার পরিদর্শক আতিকুর রহমান বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এদিন এ মামলায় জেলার বাঙ্গরা বাজার থানার বাঙ্গরা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেন শিমুল ও ফয়সাল মবিন পলাশ নামে ২ ভাইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা ‘কুমিল্লা টাইমস’ নামের একটি অনুমোদনহীন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদক। এ মামলাটিও তদন্ত করছে সিআইডি।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আনওয়ারুল আজিম বলেন, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া মামলাগুলোর নথি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে আমরা তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করে আসছি।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের বিশেষ সুপার খান মুহাম্মদ রেজওয়ান সাংবাদিকদের জানান, আমরা মামলাগুলোর তদন্ত কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত ও নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর নানুয়া দীঘির পাড়ে পবিত্র কোরআন অবমাননা ও পরবর্তীতে মন্দির ভাংচুরসহ বিভিন্ন ঘটনায় জেলায় এ পর্যন্ত মোট ১২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় ৮টি, সদর দক্ষিণ মডেল থানায় ২টি এবং দাউদকান্দি ও দেবিদ্বারে একটি করে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় পবিত্র কোরআন অবমাননা ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ঘটনার মূল হোতা ইকবাল হোসেনসহ চার আসামি গত ২৯ অক্টোবর থেকে দ্বিতীয় দফায় ৫ দিনের রিমান্ডে আছে।
