বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

সুন্দরবনের ভয়ংকর জীবন ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে শান্তিতে আছি: সাক্ষাতকারে বনদস্যুরা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২১, ০৩:৫৩

সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে চলত দস্যুতা। সেই দস্যুতার হাত থেকে রেহাই পেত না মৎস্যজীবী, মৌয়াল ও বাওয়ালরা। সুন্দরবনের এই ভয়ংকর দস্যুরা এখন স্বাভাবিক জীবনে। সরকার ঘোষিত কর্মসূচির আওতায় আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন ৩২৪ দস্যু। দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরে উচ্ছ্বসিত তারা। তারা বলছেন, আগে যখন দস্যুতা করে বেড়াতাম তখন মনে ভয় কাজ করত কখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যাই। সুন্দরবনে প্রতি মুহুর্তে আমরা ভয়ংকর সময় পার করতাম। একদিকে মৃত্যু অপরদিকে জীবিকা। প্রাণ হাতে নিয়েই গহীন অরণ্যে দস্যুতা করে বেড়াতে হত। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আনন্দটাই এখন অন্যরকম। আগে বছরে একবার পরিবারের সদস্যদের মুখ দেখতে পারতাম। আর এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়েই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছি। দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা একাধিক বনদস্যু ইত্তেফাককে দেওয়া সাক্ষাতকারে এমনটাই বলেছেন।

২০১৫ সাল থেকে সুন্দরবনে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। তাদের অভিযানে শতাধিক দস্যু নিহত হয়। পরে দস্যুদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয় র‌্যাব। সেই সুযোগ নিয়েই বনদস্যুরা এখন স্বাভাবিক জীবনে। এই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে কেউ সরকারি সাহায্য নিয়ে দোকান দিয়েছেন। কেউবা মাছ ধরার পেশায় রয়েছেন। আবার অনেকেই গবাদিপশু নিয়ে তা লালন-পালন করছেন। কেউ ঘর নিয়েছেন। এভাবে যার যা আয় হচ্ছে তা দিয়েই সুখে-দুখে চলছে তাদের সংসার।

কথা হচ্ছিল রামপাল সদরের নাজিম শেখের (৫৫) সঙ্গে। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল সদরে। ৬ বছর ছিলেন দস্যু ইলযাস বাহিনীর একজন সদস্য হয়ে। তার কাজ ছিলো অপহৃত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ আদায় করা। ওই বাহিনীতে ৪০/৪৫ জন সদস্য ছিলেন। মুক্তিপণের অর্থের মধ্যে প্রতি হাজারে একশত টাকা পেতেন একজন সদস্য। বাকি অর্থের ৬০ ভাগই পেতেন বাহিনী প্রধান। বাকি টাকা পেতেন গ্রুপের অন্য সদস্যরা। এখানে অস্ত্রের ভাড়ার টাকাও নিতেন বাহিনী প্রধান।

নাজিম শেখ জানান, প্রতিটি বড় মাছ ধরার ট্রলারকে তিন মাসের জন্য ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করতে হত। নইলে সুন্দরবনে খালগুলোতে তাদের মাছ ধরার সুযোগ ছিলো না। আর ছোট আকারের ট্রলারকে দিতে হত ২০ হাজার টাকা। আর বড় ধরনের ফিশিং কার্গোকে দিতে হত এক লাখ টাকা। এই পরিমাণ টাকা দিলেই এসব মাছ ধরার ট্রলারকে বনদস্যুরাই নিরাপত্তা দিত, যাতে অন্য কোন বাহিনীর কেউ তাদের বিরক্ত না করে। নাজিম জানান, আত্মসমর্পণের পর তিনি সরকার থেকে অর্থ পাচ্ছেন। তার মেয়ের লেখাপড়ার জন্যও প্রতিমাসে র‌্যাবের পক্ষ থেকে ২ হাজার করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। আগে বছরে একবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতেন। এখন যাযাবর জীবন ফেলে সেই পরিবারকেই সময় দিচ্ছেন তিনি। আত্মসমর্পণকারীরা বলছেন, বনদস্যুদের ৩২টি গ্রুপকে অস্ত্রের সিংহভাগ সরবরাহ করতেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের লাল্টু মেম্বার। এই লাল্টু মেম্বারের প্রধান কাজই ছিলো অস্ত্র চোরাচালান করা।

হানিফ শেখের বাড়ি রামপালের গৌরামবাগ এলাকায়। তিনি মানজু বাহিনীর সদস্য ছিলেন। সাগরে যারা মাছ ধরত তাদের কাছ থেকে তিন মাসের জন্য ২০ হাজার টাকা করে নিতেন। এছাড়া যারা মধু, গোলপাতা আহরণের জন্য যেতেন তাদের কাছ থেকেও ২০ হাজার করে টাকা নিতেন তিনি।

বড় ভাই গ্রুপের সদস্য ছিলেন লিটন আলী। তার বাড়ি রামপালের রাজনগর এলাকায়। এদের গ্রুপের ১৭ জন সদস্য ছিলেন। ইউনূস শেখ একই গ্রুপের সদস্য। মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে তিনি বনদস্যু হন। এখন ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। আর বাকি মিয়া হলেন ওই গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড। তিনিও দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আনন্দে বিভোর।

হারুন শেখ (৫৫)। ১৯৯৮ সালে যোগ দেন জুলফিকার গ্রুপ ওরফে মাইজ্যা ভাইয়ের দলে। দীর্ঘদিন সুন্দরবনে দস্যুতা করে বেড়িয়েছেন।  মাসুদ শেখ, আব্দুল মাজেদ ছিলো হান্নান বাহিনীর সদস্য। এসব গ্রুপকে অর্থ দিয়েই সুন্দরবন থেকে জেলেদের মাছ সংগ্রহ করতে হত। শুধু মাছই নয় যারা কাঠ, গোলপাতা ও মধু সংগ্রহে যেতেন তাদেরকেও অর্থ দিয়ে বনে প্রবেশ করতে হত। কিন্তু র‌্যাবের অভিযানে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তাদের দস্যুতা ছেড়ে দিতে হয়। যারা দস্যুতা ছেড়ে দেননি তাদের অনেককে বনে জীবন দিতে হয়েছে। তারা বলেন, আমরা যখন দস্যু ছিলাম তখন আমাদের পরিবারের সদস্যরা একঘরে হয়েছিলো। বাড়ির বাইরে গেলে তাদের স্ত্রী বা ছেলেমেয়েদের ডাকাতের সন্তান বলে তাচ্ছিল্য করত এলাকাবাসী। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ ছিলো। ছেলে-মেয়েরা এমন অভিযোগ করলে আমাদের খারাপ লাগত। এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতই আমাদের সন্তানরা স্কুলে যাচ্ছে। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ফিরে আসলেও কি করব, খাবার জোগাড় কিভাবে হবে সেটা নিয়ে তো চিন্তা ছিলই। পরে সরকারের আত্মসমর্পণের সুযোগ গ্রহণ করে দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি। সরকার আমাদের পুনর্বাসন না করলে হয়ত এ জীবনে আলোর মুখ দেখা হত না। অন্ধকারেই জীবন কাটাতে হত। 

ইত্তেফাক/এমআর

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

সুন্দরবনে থার্টি ফার্স্ট উদযাপন করেছেন ২২৫০ পর্যটক

সুন্দরবনে বাঘের হামলা: জেলের লাশ উদ্ধার

শরণখোলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা 

সুন্দরবনের পর এবার উপকূলকে দস্যুমুক্ত করার ঘোষণা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বৃষ্টিতে ভেসে গেলো জেলেদের স্বপ্ন

মুক্ত বাতাসে ১৭ বন্যপ্রাণী

বিশেষ সংবাদ

সুন্দরবনে পর্যটক কমলো কেন 

হাজত থেকে বেরিয়ে ফের বিষ দিয়ে মাছ মারছিলেন তিনি