গত জুনে সিঙ্গাপুরে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে বৈঠকের পর ধারণা করা হচ্ছিল যে দুইদেশের মধ্যে সম্পর্কের চিড় জোড়া লাগতে শুরু করেছে। অবশ্য বৈঠকের পর থেকে উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্কের গতিধারা সেপথেই এগুচ্ছিল। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে তখন নানা ইতিবাচক কথা শোনা যাচ্ছিল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও আর কোনো আক্রমণাত্মক বক্তব্য রাখেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তখন টুইটে বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়া এখন আর কোনো পারমাণবিক হুমকি নয়। দুইদেশের মধ্যে সম্পর্ক যখন নতুন এক মোড়কে রুপান্তরিত হচ্ছিল ঠিক তখনই কয়েকটি ঘটনা এসব ধারণাকে পাল্টে দিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার গোপন ১৩টি পরমাণু ঘাঁটির তথ্য ফাঁস ও নতুন করে তাদের ‘অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের সফল পরীক্ষা’- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের নিরস্ত্রীকরণে যাওয়ার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
গত শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, নতুন যুদ্ধাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে উত্তর কোরিয়া। তাদের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমও খবরটিকে গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছে। শীর্ষ নেতা কিম জং উন ওই পরীক্ষা কার্যক্রম নিজে পরিদর্শন করেছেন বলে খবরে বলা হয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশের তাত্ক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে হঠাত্ কেন উল্টো পথে উত্তর কোরিয়ার আবির্ভাব? সবকিছুতো ঠিকঠাক মতোই চলছিল। তাহলে নতুন করে উত্তর কোরিয়া কেন তাদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। অবশ্য এর আগে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে একটা অভিযোগ উঠেছিল সিঙ্গাপুরের বৈঠকের পর চুক্তির শর্ত ভেঙে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। বিষয়টিকে হয়তো উত্তর কোরিয়া স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি বলে অনেকে মনে করছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উত্তর কোরিয়া একটি পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্র ও রকেট উেক্ষপণ কেন্দ্র ধ্বংস করলেও যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞার খড়গ তুলে নিচ্ছে না। বরং তারা নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেই উত্তর কোরিয়ার পক্ষে ভালো ভালো কথা বলছেন। আর এতে করে ভিতরে ভিতরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে উত্তর কোরিয়া।
উত্তর কোরিয়া যে ভিতরে ভিতরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে তার প্রমাণ মেলে আরো একটি বিষয় থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক উত্তর কোরিয়ার ভেতর ১৩টি অঘোষিত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি চিহ্নিত করার দাবি করেছে। দেশটিতে এরকম সম্ভাব্য ২০টির মতো ঘাঁটি আছে বলে ধারণা করছেন তারা। ওয়াশিংটন ভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষকরা এ তথ্য জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, পিয়ংইয়ংকে যে পারমাণবিক ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পথ থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে তা আজ ভেস্তে যেতে চলেছে।
গবেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেমন প্রত্যাশা করছে সে অনুযায়ী কাজ করছে না উত্তর কোরিয়া। বরং তারা এসব করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কেননা সিঙ্গাপুর বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উত্তর কোরিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে হাঁটবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে পথ মাঝে এসে অনেকটা থমকে গেছে। তবে চুক্তির একটি দুর্বল দিক হচ্ছে কীভাবে উত্তর কোরিয়া তার এই প্রতিশ্রুতি পালন করবে সে বিষয়ে তেমন কোনো দিক নির্দেশনা নেই। আর এ কারণে চুক্তিটির কার্যকরিতা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের অনেকের কাছেও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরীয় আলোচকরা এখন পর্যন্ত পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে তাদের অস্ত্র কর্মসূচির আকার ও ক্ষমতা সম্পর্কে ?সুনিশ্চিত তথ্য আদায় করতে পারেননি। পারেননি বর্তমান মজুদ অস্ত্র না মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি আদায় করতে।
আবার অনেকে এক্ষেত্রে পুরো দোষ উত্তর কোরিয়ার কাঁধে উঠিয়ে দিতে নারাজ। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রথমদিকে অনেক গতিশীলতা লক্ষ্য করা গেলেও মাঝে এসে তার কিছুটা ভাটা পড়ে যায়। তারা বলছেন, ইদানিং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কিছুটা স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। আর এ কারণে উত্তর কোরিয়া নিরাশ হয়ে উঠছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র মুখে নানা প্রশংসার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তথা নিজের ঘর গোছাতে বেশি ব্যস্ত। কেননা মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে তার দলকে অনেকটা কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে।
