একটি স্বপ্নবাজ বন্ধুবৃত্ত

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৭:৩৪

সাতটি পাঁপড়ি মিলে যেমন গোলাপের মতো প্রস্ফুটিত একটি আকর্ষণীয় ফুল হয়— তারা তেমনি সাতটি জেলার সাতটি পাঁপড়ি হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নামক ফুল গাছে একটি গোলাপ হয়ে ফুটেছে। তাদের সুবাস তারা পুরো জাতিকে দিতে চায় তাদের সাফল্য দিয়ে। তাইতো তারা স্বপ্ন দেখে— ব্যক্তি হওয়ার স্বপ্ন, মানুষ হওয়ার স্বপ্ন, সফল হওয়ার স্বপ্ন। তবে তারা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে না— তাদের স্বপ্ন তাদেরকে ঘুমোতে দেয় না।

২০১৬ সালে প্রথম বর্ষে যখন ক্লাশ শুরু হয় তখন তারা খুঁজে নেয় একে অপরকে। মনখোলা হূদয়ের সুবাস চুম্বকের মতোই তাদেরকে কাছে টেনে নেয় ধীরে ধীরে। আজ তিন বছর পরেও তাদের সম্পর্কে এতটুকু চিড় ধরেনি। কৈশোরের বন্ধুত্বের মায়া ফেলে তারা যখন স্বার্থপর একটি ভুবনে পা ফেলেছিল নিজেকে বৈশ্বিক করার জন্য— তার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুত্ব সম্পর্কে কত নেতিবাচক কথাই শুনতে হয়েছে। নেতিবাচক কথা তাদের কাছে মিথ্যে মনে হচ্ছে এখন। কথায় আছে— ‘একজন ভালো বন্ধু একটা লাইব্রেরির সমান’। তারা যেন একটি বইয়ের লাইব্রেরিতেই বসবাস করছে।

তারা বিশ্ববিদ্যালয় নামক বৃন্দাবনে এসে বিষের বদলে মধু আহরণ করছে। তারা সাতজন আবেগগুলোকে ভাগ করে নিতে জানে। মধ্যবিত্ত জীবনের নির্মমতাকে মোকাবেলা করেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে তারা। স্বপ্ন ছোঁয়ার লক্ষ্যে তারা স্বপ্নের বীজ বপন শুরু করে দিয়েছে। একটি বন্ধুবৃত্তে বিভিন্ন স্বপ্নের মানুষ থাকে। আর প্রতিটি স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রয়োজন চর্চা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে চর্চার জন্য রয়েছে বিভিন্ন রকমের সংগঠন। সাংগঠনিক হয়ে উঠার জন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত হয়।

শাহিন কুমিল্লা থেকে মতিহারে পড়তে এসেছে। তার স্বপ্ন ছিল সে একজন সাংবাদিক হবে— সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে। ক্যাম্পাসের পরিচিত একজন সে। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ সংগ্রহ করে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে যাচ্ছে শাহিন। সে রাবিসাসের বর্তমান কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছে।

আজম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ‘বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের’ দপ্তর সম্পাদক  হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। তার অভিনয় দিয়ে ইতোমধ্যে ক্যাম্পাসের সকলের মন জয় করে নিচ্ছে। তার ইচ্ছা সে একজন সফল সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে। তার বাড়ি চুয়াডাঙা জেলায়।

আফরিন বিভাগের রেজাল্টে প্রথম। পরিশ্রম দিয়ে সে তার লক্ষ্য পূরণ করে যাচ্ছে। তার দেশের বাড়ি দিনাজপুর। জাহিদ পরিশ্রমী একটি ছেলে। তার ইচ্ছা সে একজন সফল সরকারি কর্মকর্তা হবে।  তার বন্ধুবৃত্তে সে বইপোঁকা হিসেবেই পরিচিত। বগুড়া জেলায় তার বাসা। বন্ধন একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে উঠছে। তার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ব্যবসায় তার মাথা পাঁকা। সে সফল একজন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চায়। তার বাড়ি রাজশাহী। নঁওগার শ্রাবন্তী একজন ভালো অভিনেত্রী। ভালো আবৃত্তি করতে পারে সে। ‘বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট’র আবৃত্তি সম্পাদক সে। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা মনি ক্যাম্পাসের একজন নামকরা কণ্ঠশিল্পী। সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ‘অরণী সাংস্কৃতিক সংসদ’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছে।

তাদের সংঘবদ্ধতাই তাদেরকে স্বপ্ন দেখাতে শিখিয়েছে। তারাই তাদের শিক্ষক। তাদের পাগলামি, তাদের অভিমান, তাদের আনন্দ, তাদের কষ্টগুলোর বিচার তারা নিজেরাই করে। তারা যেন মান্না দে’র কফি হাউস গানের সাতজন বন্ধুর প্রতিচ্ছবি! কেউ হতাশার চাদরে ঢাকা পড়লে সবাই একজনের হতাশার ভাগিদার হতে চায়। ক্যাম্পাসের প্রতিটি আঙিনায় তাদের পদাচরণ প্রতিনিয়ত। বিভাগ অথবা ক্যাম্পাসে তারা নিজেরাই  যেন একটি অঘোষিত সংগঠন। যে সংগঠনের কাজ আত্মজিজ্ঞাসা করা, সে সংগঠন শেখায় কিভাবে ভালোবাসতে হয়, কিভাবে পেছনে ফেলে আসা হতাশাগুলোর থাবা থেকে বের হয়ে স্বপ্ন দেখা যায়। কিভাবে মধ্যবিত্ত জীবনের হাজারো গল্পের বিষ উপড়ে ফেলে সে বিষকে মধুতে পরিণত করা যায়। বাবা-মায়ের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে কিভাবে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে হয়। কিভাবে হাজারো সমালোচনাকে পিছনে ঠেলে জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যেতে হয়। তারা জানে তাদের সফলতা এখনও অনেক দেরি, তারা এটাও জানে তাদের স্বপ্ন ছোঁয়া এখনও যোজন যোজন দূরত্বে অবস্থান করছে।

প্রথম বর্ষের মতো তারা এখন আর আনাড়ি নয়। তারা এখন অনেক পরিণত এবং বুদ্ধিদীপ্ত। দেখতে দেখতে তাদের সোনালি দিনগুলো ফুরিয়ে আসছে। তারা এটাও জানে সাতটি পাঁপড়ি হয়ে ফোটা গোলাপের ভাঙন একদিন হবে। জীবন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে স্বপ্ন ছিনিয়ে আনার জন্য। হয়তো তারা প্রত্যেকেই হারিয়ে যাবে কালের স্রোতে। তারা অবগত আছে— তাদের নির্মেদ দেহ আর নির্মেঘ মন নিয়ে এ নবযৌবনের নিবিড় মাধুর্যে মিশিয়ে নিটোল মুুক্তোর মতোই চিরদিনের স্মৃতির মধ্যে অক্ষয় থেকে যাবে তারা— তাইতো তাদের বন্ধুত্বের নাম ‘একটি স্বপ্নবাজ বন্ধুবৃত্ত’।

ছবি: আমির