চালান হার্লে-ডেভিডসন মোটরবাইক। পরেন স্মার্ট জ্যাকেট ও বাইকিং গ্লাভস। ২৭ বছর বয়স্ক অর্জুন বাফনাকে দেখেই বোঝা যায়, তিনি এক সম্পদশালী তরুণ। তিনি এমন একটি পরিবার থেকে এসেছেন, যাদের রয়েছে ভারতের সর্ববৃহ এবং সবচে’ পুরনো অটোমোবাইল ডিলারশিপ। বয়স খুব বেশি নয়, অথচ তিনি এরইমধ্যে তাদের পারিবারিক ব্যবসাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। প্রসঙ্গক্রমে অর্জুন বলছিলেন, ‘আমি অটোমোবাইল ভালোবাসি। এটিই আমার প্যাসন। কারণ গাড়ি ও বাইককে ঘিরে আমি বড় হয়েছি। আমি পারিবারিক পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার শিক্ষা পাইনি। সেজন্য পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি আলাদা কিছু করার চেষ্টা করছি আর তাতে সাফল্যের মুখও দেখছি।
পাঁচ বছর আগে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর থেকে প্রতি বছরই একটি নতুন কোম্পানি খুলছেন অর্জুন। মোটরবাইক শোরুম ছাড়াও একটি লজিস্টিকস কোম্পানি ও একটি ট্রাভেল ফার্ম চালান তিনি। গাড়ি সাজানোর ক্ষুদ্র ব্যবসাও রয়েছে তার। কিন্তু তার সব ব্যবসা সব সময় নির্ঝঞ্ঝাট ছিল না। ব্যয়ভার বহন করতে না পারায় চার্টার্ড এয়ারলাইনের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। অর্জুন বলছিলেন, ‘গত বছর অর্থনীতি ভালো অবস্থায় আমি আমার ৩২ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিলিওনেয়ার ক্লাবে নাম লেখানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলাম। কিন্তু এখন তা সম্ভব না। এখন মনে করছি, আরো তিন বছর পর আমি লক্ষ্যে পৌঁছুবো।
আগামী দশ বছরে ভারতে বিলিয়নের সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে যাবে এবং বিলিয়নের সংখ্যাটা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় মুম্বাইয়ে অনেক বেশি থাকবে। ভাগ্যান্বেষী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণরা ভিড় করছে মুম্বাইয়ে। এসব তথ্য জানা গেছে নাইট ফ্রাংকের বার্ষিক সম্পদ রিপোর্ট থেকে। বিলিয়নের সংখ্যার বিচারে তালিকা করলে পৃথিবীর সেরা দশে ঠাঁই করে নেয় মুম্বাই। কিন্তু এ দিয়েই শহরের আসল চিত্রটা ফুটে ওঠে না। বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের পাশেই চোখে পড়ে বস্তি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি জ্যামে আটকা পড়লে পাশের বাস থেকে থুতু এসে পড়ে সেই গাড়ির উপর। ভারতের দরিদ্রতম লোকেদের অনেকেরই বাস এ শহরে। তারপরেও মুম্বাইয়ের ভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে— সবাই অর্থ উপার্জনের ধান্ধায় ব্যস্ত। অন্য শহরগুলো থেকে এ শহর এ কারণেই ভিন্ন যে, চেষ্টা চালিয়ে গেলে ফলাফল আসে।
৩৯ বছর বয়স্ক সুধির নায়ার সুযোগটা দুই হাতে লুফে নিয়েছিলেন। পঁচিশ বছর আগে মুম্বাই বিমানবন্দরের কার্গো লোডার ছিলেন তিনি; দিনে আয় ছিল দুই ডলারেরও কম। আজ তিনি এরসোর্স ইনফোটেক নামের একটি আইটি ফার্ম চালান। ১৪০ জন কর্মী এতে নিযুক্ত রয়েছে। ফার্মটির সম্পদের পরিমাণ ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আলাপকালে তিনি বলছিলেন, ‘এটি ছিল চমত্কার এক অভিযান। অনেক কিছু শিখতে হয়েছে আমাকে। পরিবার লেখাপড়ার খরচ চালাতে পারে না বলে নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় স্কুল ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। এরপর তিনি নিজে নিজে শিখেছিলেন, কীভাবে কম্পিউটার কোড রাইট করতে হয়। ১৯৯০’র দশকে ভারতের বাজার উন্মুক্ত হয়ে যাওয়াতে সুধিরের সামনের রাস্তা খুলে গিয়েছিল।
গত বিশ বছরে সুধির পৃথিবীর অনেক শহরে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন; কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন মুম্বাইকে। এর কারণটা না হয় তাঁর মুখেই শুনি, ‘অনেক কিছু ঘটার শহর এ মুম্বাই। এখানকার লোকজন খুব খোলা মনের। তারা নতুন ধারণা ও প্রযুক্তিকে সব সময়ই স্বাগত জানায়। প্রযুক্তি যে ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির পথে সহায়ক, তা খুব ভালোই জানে এ শহরে লোকজন। সে জন্যই আমি এ শহরে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে সফ্টওয়্যার সলিউশান্স সরবরাহের জন্য মাত্র বছর ১৬ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কোম্পানিটি খুলেছিলেন চিরাগ বৈদ্য। এর এক বছর আগেই তিনি জীবনে প্রথমবারের মতো কম্পিউটার ধরেছিলেন। সেটি তাঁকে তাঁর বোন দিয়েছিলেন জন্মদিনের উপহার হিসেবে। দারুণ এ জিনিসটির মাধ্যমে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন নতুন এক বিশ্বকে, যার নাম ইন্টারনেট। প্রথমে তিনি অন্য দশজনের মতো গেমস খেলতেন ও মজা করতেন। কিন্তু এক সময় চিন্তা করলেন, এটিকে দিয়ে কীভাবে অর্থ কামানো সম্ভব। সে চিন্তা থেকেই পরবর্তীতে তাঁর ব্যবসায় নামা। ১৯ বছর বয়সী চিরাগ এখনো গ্র্যাজুয়েট হননি। কিন্তু এরইমধ্যে ছয়টি ব্যববসা চালাচ্ছেন তিনি, যার প্রায় সবই ইন্টারনেট-ভিত্তিক। তাঁর মতে, কারো মধ্যে ভালো আইডিয়া থাকলে সেটিকে কাজে লাগানোর জন্য মুম্বাই হচ্ছে উত্কৃষ্ট জায়গা। এ শহরের লোকজন মেধাকে মূল্য দেয়। তিনি আরো মনে করেন, এ শহরে কোন ব্যবসা শুরু করার পর সঠিকভাবে কাজ করলে সাফল্য আসাটা নিশ্চিত। এর অন্যতম কারণ শহরের জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি।
অর্জুন, সুধির ও চিরাগ— এরা সবাই মনে করেন, পাঁচ বছর পর ভারতকে কোনো কিছুই পেছনে টেনে ধরে রাখতে পারবে না। দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থান দেখেই তাঁদের মনে এমন ধারণা জন্মেছে। এদের প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেন, ভারত অনেক দূর এগিয়ে যাবে আর তার মানে তরুণদের জন্য অপেক্ষা করছে অফুরন্ত সুযোগ।
