শিরোনাম শুনে হয়তো মনে হচ্ছে কোনো ভিনদেশী মানুষ 'অতিথি নারায়ণ' উচ্চারণ করেছেন। এ প্রবাদ বাক্যটি জানে না, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সময় বদলেছে। বদলেছে অতিথি আসার ধরন। তবে আজও মধ্যবিত্ত বাঙালির ঘরে অতিথি এলে তাকে যথাসাধ্য আপ্যায়নে অভিভূত করার বাতিক রয়ে গেছে। আরেকখানা প্রবাদের ভীষণ চল, 'দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো।' বাংলাদেশিরা এই প্রবাদকে মনেপ্রাণে ধারণ করে। সিনেমা, নাটক, ওয়েব সিরিজের ক্ষেত্রে যার পরিমাণ আরও বেশি। নতুন কিছু এলে থিয়েটারমুখী না হয়ে ছোটে ফ্রি ওয়েবসাইটের দিকে। এদিক ওদিক ঢুঁ মারে, যদি মিলে যায়!
পাশের দেশ ভারত সংস্কৃতিতে আমাদের চেয়ে এগিয়ে। বিশেষত চলচ্চিত্রাঙ্গণে। বিশাল বাজার, রীতিমতো এলাহি কান্ড। 'স্যাক্রেড গেমস' নামক ওয়েব সিরিজ দিয়ে সেই বাজারে ছোটোখাটো ধাক্কা মারলো 'নেটফ্লিক্স'। নেটফ্লিক্সের সেই ধাক্কায় ওটিটি (ওভার দ্য টপ) প্ল্যাটফর্মের ভবিষ্যৎ গন্তব্য দৃশ্যমান হতে থাকে। একে একে ভারতের বাজারে আসতে শুরু করে অ্যামাজন, জি ফাইভ, সনি লিভ, হইচইসহ অসংখ্য ওটিটি প্ল্যাটফর্ম।
বাংলাদেশে ওটিটির বাজার একেবারে নতুন তা নয়। বঙ্গ বিডি, আইফ্লিক্স বহুদিন ধরে থাকলেও খুব একটা কাজের কাজ করতে পারেনি। বাংলার দর্শকদের ওটিটির আসল স্বাদটা বোধকরি প্রথম দিয়েছে 'বিঞ্জ!' একদম ফ্রি-তে আগস্ট ১৪, সদর ঘাটের টাইগারের মতোন কিছু সিরিজ এনে তাক লাগিয়ে দেয় সবাইকে। সেই পথে হেঁটে, নিজেদের মতো পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে 'চরকি' আসে বাজারে। ব্যস, চরকির মতো ঘুরতে শুরু করে ওটিটির বঙ্গ ভাগ্য! ঊনলোকিক, মরীচিকা, নেটওয়ার্কের বাইরে; অল্প সময়ে দর্শকের মন জয় করে নেয়।
ইন্টারনেটের অতি সহজলভ্য জমানায় বাংলার মানুষ এমনিতেই হলমুখী হয় না, তবে এতে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের দায়ও কম নয়। সেই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে চরকি, সিনেমাটিকের মতো নতুন প্ল্যাটফর্মগুলো। তারা জানে, বাঙালি কন্টেন্ট চায়। এর জন্য সামান্য পয়সা খরচ করতে দ্বিধা করবে না। তাই নামেমাত্র সাবস্ক্রিপশন ফি-তে ভালো ভালো জিনিস দিচ্ছে দর্শককে। কেবল দুধের স্বাদে ঘোলে মেটানো নয়, গত এক দশকে বিনোদনের স্বচ্ছতা হিসাব করলে এইসব প্ল্যাটফর্ম চাওয়ার চেয়ে বেশিই দিচ্ছে।
স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ছবিয়ালের সহকারী পরিচালক সিজু খান বলেন, 'আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে আমাদের কন্টেন্টের জোয়ার তৈরি করাটা আমার কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। ভারতে কিন্তু নেটফ্লিক্স এসে স্যাক্রেড গেমস নির্মাণ করায় নি। বরং প্রযোজকেরাই নেটফ্লিক্সকে আগ্রহী করে তুলেছিলেন এই প্রজেক্টে ইনভেস্ট করে নেটফ্লিক্সে ভারতীয় কন্টেন্টের বাজার তৈরির ব্যাপারে। ওভার দ্যা টপ বা ওটিটির এই বাস্তবতায় শুধু নির্দিষ্ট কোনো ভাষা, সংস্কৃতি বা রুচির দর্শকদের টার্গেট করে কন্টেন্ট প্রডিউস করাটা বোকামো। অথচ আমাদের দেশের বেশীরভাগ নির্মাতা, প্রযোজকেরা এখনও নতুন মোড়কে পুরনো জিনিস পরিবেশনেই ব্যস্ত আছেন!'
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশলবিদ্যা সম্পন্ন করা ইমতিয়াজ ফাহিম বিশ্ব সিনেমা-সিরিজের নিয়মিত দর্শক। ওটিটির উত্থানে তিনি অবাক হচ্ছেন না। তার মতে, 'ভবিষ্যৎ দুনিয়াটাই ওটিটির। বাংলাদেশে ভালো ভালো কন্টেন্ট তৈরি হচ্ছে। ধারাবাহিকতা আর কন্টেন্টে বৈচিত্র ধরে রাখতে পারলে ওটিটিতে বাংলাদেশের ভালো সম্ভাবনা আছে।'
বাংলাদেশে ওটিটির চাহিদা আছে, তা ঠিকই বুঝতে পেরেছে ভারতীয় প্ল্যাটফর্মগুলো। জি ফাইভ, হইচই-এ দেশের অডিয়েন্সকে পাখির চোখ করে কন্টেন্ট নির্মাণ করছে। দেশি প্ল্যাটফর্মগুলোকেও বুঝতে হবে চাহিদার জায়গাটা।
শুরুতে বলা অতিথি নারায়ণে ফেরা যাক। যদি নিজেদের স্বচ্ছতা ও কন্টেন্ট কোয়ালিটি ধরে রাখতে পারে, মৌলিক গল্পের নিয়মিত চর্চায় তৈরি করতে পারে নিজস্ব ঘরানা, তবে আসছে দিনে বাংলাদেশের বিনোদনে ভিন্নমাত্রা যোগ করবে ওটিটি। দর্শকদের কাছে তা হয়ে উঠবে 'ওটিটি' নারায়ণ!
