সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৩ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

হাসান আজিজুল হক 

পাথুরে জীবনের খনন-শ্রমিক 

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২১, ১৪:২১

জাগতিক নিয়মে কলম থেমে গেল হাসান আজিজুল হকের। জীবনের শুরুতে চৌদ্দ-পনেরো বছর তিনি যে রাঢ় বাংলায় কাটিয়েছিলেন, সেই জীবন আর প্রকৃতিই তাঁর মানসভুবনের মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। রুক্ষ, নীরস, টনটনে রাঢ় মাটি আর শ্রমনিষ্ঠ প্রান্তিক মানুষের জীবন তাঁর বোধের জগতে রুদ্র, তপ্ত, পাথুরে জীবনের উদ্ভাস ফুটিয়ে তুলেছিল। 

সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দেশবিভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, ব্রিটিশভারত রাজনৈতিক পরিবেশের অস্থিরতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ছয়দফা আন্দোলন, স্বাধীনতাযুদ্ধসহ অবিভক্ত ভারত-বাংলাদেশের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কাল যাপনের অভিজ্ঞতা। মূলত নিম্নবিত্ত দরিদ্র শোষিত বঞ্চিত মানুষের জীবন সংগ্রামই ছিল তাঁর লেখার মূল ভিত্তি। 

হাসান আজিজুল হক।

খনি-শ্রমিকের মতোই তিনি ক্রমাগত জীবন খুঁড়ে খুঁড়ে জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ক্লেদ গ্লানি আর অন্ধকার বেদনার রন্ধ্রগুলো আবিষ্কার করে চলছিলেন। তাঁর হাতের কলম যেন এক ধারালো খনিত্র। সে কলমে তাই বেরিয়ে আসে ‘শকুন’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘ভূষণের একদিন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘জীবন ঘষে আগুন’ বা ‘শত্রু’র মতো গল্প কিংবা ‘আগুন পাখি’র মতো উপন্যাস। পাথুরে জীবনে খনিত্র চালনা করে করে যে আগুন ছিটকে পড়েছে তা দিয়ে হাসান সাজিয়েছেন তাঁর লেখার জগৎ। 

শৈশব থেকেই লিখতে শুরু করেছিলেন তিনি। তিনি যখন বর্ধমানের কাশীশ্বরী স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সে সময়ে ঐ স্কুলে রাজা সৌমেন্দ্র চন্দ্র নন্দীর আগমন উপলক্ষ্যে একটি মানপত্র লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর সৃজনশীল লেখার যাত্রা শুরু হয়। পরে কলেজবার্ষিকে তাঁর কয়েকটি গল্প-কবিতাও ছাপা হয়। প্রবেশিকা পরীক্ষার পরে তিনি ‘মাটি ও মানুষ’ নামে একটি উপন্যাসও লিখেছিলেন, কিন্তু সেটি অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এটি ছাড়াও তিনি ‘শামুক’ (১৯৫৭)) ও ‘বৃত্তায়ন’ (১০৬০) নামে দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন, কিন্তু এ দুটি রচনা নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল না। 

হাসান আজিজুল হক।

‘শামুক’ উপন্যাস পূর্বমেঘ পত্রিকায় আংশিক প্রকাশিত হয়েছিল এবং ‘বৃত্তায়ন’কে তিনি উপন্যাস হিসেবে সার্থক বলে মনে করেননি। সাহিত্যজীবনের শেষ পাদে এসে তিনি তিনটি উপন্যাস লিখেছিলেন। এর একটি ‘আগুনপাখি’ (২০০৬) অপরটি ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ (২০১৩)। ‘আগুনপাখি’ উপন্যাস তাঁকে বিপুল খ্যাতি এনে দিয়েছিল। দেশত্যাগের নির্মমতা ও বেদনা এ উপন্যাসের আখ্যান। এ বইয়ের জন্য ২০০৮ সালে তিনি পেয়েছেন আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার। ‘শিউলি’ (২০০৬) নামে একটি উপন্যাসিকাও তাঁর লেখার তালিকায় ছিল।

উপন্যাস নয়, গল্পই ছিল তাঁর আরাধ্য। উপন্যাসে একটি জীবন বলয় নির্মাণ করা হয়, যার একটি সূচনা বিস্তার এবং উপসংহার আছে। কিন্তু গল্পের শেষ নেই। ছোটগল্প জীবনের কোনো এক খণ্ডিত অংশের ওপর আলো ফেলে, বাকি অংশ থাকে অনাবিষ্কৃত। হাসান আজিজুল হক চাইতেন ছোটগল্পের মধ্য দিয়েই তিনি পোড় খাওয়া সংগ্রামী মানুষ এবং দেশ-কাল-সমাজ-সংস্কৃতি-অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা মানুষের মনোজগতের বহুতলবিশিষ্ট স্তরগুলো তাঁর এক-এক গল্পে এক-এক ভাবে উন্মোচন করবেন। উপন্যাসের মধ্যেকার এক জীবনের সমাপ্তিতে হয়তো তৃপ্ত ছিলেন না তিনি। তাই গল্পের জগৎই ছিল তাঁর বিচরণের ক্ষেত্র।

সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ সাহিত্য পত্রিকায় ১৯৬০ সালে তাঁর লেখা ‘শকুন’ গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়েই লেখক হিসেবে তিনি সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একজন তরুণ লেখকের হাত দিয়ে ‘শকুন’-এর মতো এমন একটি আধুনিক শিল্পরীতির গল্প-যেখানে একাধারে রয়েছে শ্রেণিচেতনার মেটাফর, উত্তর বঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের জীবন্ত ডায়ালেক্ট, গ্রামীণ প্রকৃতি ও প্রতিবেশ বর্ণনায় অসাধারণ ব্যঞ্জনাময় ভাষা, অদ্ভুত নৈঃশব্দ্যে পরিপূর্ণ রহস্যময় আবহের মধ্যে শকুনের পতন এবং বালকদের কথোপকথনের তীক্ষ শাব্দিক দ্যোতনা, যা পাঠককে ক্রমশ সহজতার ভেতর দিয়ে এক গূঢ় গভীর দৃশ্যান্তরে নিয়ে যায়—তা যেন ছিল বিস্ময়ের ব্যাপার। 

হাসান আজিজুল হক।

একই বছর পূর্বমেঘ পত্রিকায় ‘একজন চরিত্রহীনের সপক্ষে’ শিরোনামের গল্প প্রকাশিত হলে ভিন্নধর্মী কথাসাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্যমহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ক্রমশ তাঁর গল্পের ভুবন বিস্তৃত হতে থাকে। দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তাঁর গল্প ছাপা হতে থাকে। গল্পেই তিনি নির্মাণ করতে থাকেন এক ব্যতিক্রমধর্মী কথাসাহিত্যের জগৎ। অভাব, খরা, দুর্ভিক্ষ, রোগব্যাধি পীড়িত নিরন্ন, ক্ষুধার্ত, বাস্তুচ্যুত, ভূমিহীন, আশাহীন, ভরসাহীন মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা বর্ণিত হতে থাকে তাঁর গল্পগুলোতে। 

দেশভাগ, দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধ, ঔপনিবেশিকতা, সামন্তবাদী শোষণ-বঞ্চনার চিত্র তাঁর গল্পে বারবার উঠে এসেছে। এই জীবনকে চিত্রায়িত করতে তিনি এক ব্যতিক্রমী ভাষাশৈলী আশ্রয় করেছেন। এ ভাষা একাধারে নিরাবেগ, নির্মোহ, রূঢ় বাস্তবতার আগুনে পোড়ানো টনটনে, কঠিন, নির্মেদ; অন্যদিকে তা রূপক ব্যঞ্জনায় মন্দ্রিত। রাঢ় বঙ্গের আঞ্চলিক ভাষাকে তিনি এমন অনায়াস দক্ষতায় ব্যবহার করেছেন যা তাঁর গদ্যকে দিয়েছে এক অফুরন্ত জীবনীশক্তি।

ধ্রুপদী বিশ্বসাহিত্যের বিপুল পাঠ অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক সাহিত্যচিন্তা, আন্তর্জাতিক বিশ্ববীক্ষা, সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতি জ্ঞান, তাঁর লেখক মানসকে সমৃদ্ধ করেছে। মানুষ ও প্রকৃতির নিবিড় পাঠের ভেতর দিয়ে তিনি সাহিত্যে যে আপাতসরল জীবনঘনিষ্ঠ ভাষাভঙ্গি নির্মাণ করেছেন তা উত্তরাধুনিক সাহিত্যশৈলীরই ভিন্নমাত্রিক রূপকল্প।

গল্প-উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে কথাসাহিত্যের কথকতা (১৯৮১), অপ্রকাশের ভার (১৯৮৮), একাত্তর: করতলে ছিন্নমাথা (২০০৫), রবীন্দ্রনাথ ও ভাষাভাবনা (২০১৪) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কয়েকটি স্মৃতিকথাও তিনি লিখে গিয়েছেন। এগুলো হলো-ফিরে যাই ফিরে আসি (২২০৯), উঁকি দিয়ে দিগন্ত (২০১১), টান (২০১২), লন্ডনের ডায়েরি ২০১৩) ও এই পুরাতন আখরগুলি (২০১৪)। স্মৃতিকথাগুলোতে শুধু তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতাময় জীবনের ঘটনাই বর্ণিত হয়নি; এগুলোকে বলা চলে তাঁর সাহিত্যভাবনা ও জীবনদর্শনের নানা উদ্ভাসে উজ্জ্বল এক-একটি মানসভুবন। 

তাঁর দৈহিক প্রয়াণ হলেও তিনি চিরায়ুষ্মান হয়ে থাকবেন সাহিত্যে।

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

মঈন ও তার বাইসাইকেল 

‘তোমরা নতুন লেখক তৈরি করো না বাপু’

অন্যের সিলেবাসে চলার দাসত্ব ও আত্মহত্যার দর্শন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ফাদার দ্যতিয়েন যেভাবে হয়ে ওঠেন বাঙালির আত্মজন 

জীবন কি ‘পোকা’ হয়ে ওঠারই নাম? 

কবিতা

অভিভূতকর অপেক্ষা