জুয়েল মহাজন মাথায় পলিথিনটা গুজে নিলো ভালো করে। মাথা তবুও ভিজে যাচ্ছে। বাসায় ফেরার তাড়া। একটা বাস এলো। কিন্তু উঠতে পারলো না। কখনো কখনো এই শহরে বৃষ্টির ফোঁটার সংখ্যার চেয়ে মানুষ বেশি হয়। বাসভর্তি মানুষ। দীর্ঘ সময় চেষ্টার পরও বাসে উঠতে না পেরে বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটতে শুরু করলো।
অনেকদিন ইচ্ছে করে ভেজা হয় না তার। কিছু সময় পর সে খেয়াল করলো তার মাথায় উদ্ভট সব চিন্তা আসছে। আচ্ছা জুয়েলেরতো দিন এনে দিন খাওয়া ছাড়া তেমন কিছু নেই। তবুও তার নামের শেষে মহাজন শব্দটা কেন? নামটা তার বংশীয় নয়। স্কুলের কেরানি স্যাররা এমনই। নিজেদের পছন্দমতো নাম মিলিয়ে রেজিস্ট্রেশন ফরম পূরণ করে। এরপর থেকে এই নামই বয়ে বেড়াতে হয় তাকে আজীবন। অফিসে অনেকেই মহাজন শব্দটা নিয়ে প্রায় হাসাহাসি করে। পিয়নেরাও মাঝে মাঝে তাকে মহাজন স্যার বলে সম্বোধন করে।
জুয়েল ঠিকই বুঝতে পারে এটা সম্মান নয় বরং উপহাস। ব্যাটারা বড্ড ত্যাদর। মাঝে মাঝে বলে বসে, আপনিতো মহাজন। আপনার আবার কিসের অভাব স্যার? জুয়েলের খুব ইচ্ছে করে নামটা এভিডেভিড করে বদল করতে।
বৃষ্টি কমার লক্ষণ নেই। পুরো শরীর ভিজে গেছে।
জুয়েলের স্ত্রী ফোন করেছে। ফোন বের করে স্ত্রীর নম্বর দেখে তার মেজাজ গরম হয়।
মনে মনে বলে মহিলাটার আক্কেল জ্ঞান আজো হলো না। ফোন ধরলেই বলে বসবে, তুমি কি আমারে ডাক্তার দেখাইবা না শিমুর বাপ?
ডাক্তার দেখাতে কেমন খরচ হয় সে নিয়ে কোনো ধারণা আছে তার? মেয়ে দুটা বড় হয়েছে। পড়াশোনার খরচ যোগাতে তার জীবন যায় যায়।
সন্ধ্যা নেমেছে। ফুটপাথে বৃষ্টির পানি জমেছে। রোডল্যাম্পের আলোতে সে পানি আরো চকচক করছে। জুয়েলের মনে হচ্ছে সে পানিতে বুঝি মাছ জমেছে।
গ্রামে ছোটবেলায় বৃষ্টির পানিতে পুকুর ভেসে মাছ ছড়িয়ে পড়তো আশে পাশে। জুয়েল হাত দিয়ে মাছ খুঁজতো।
পুটি, তেলাপিয়া, কই মাছ ধরতো। সে কি আনন্দ! বাড়িতে আনলে সেগুলো কড়া করে ভাজা হতো।
ঢাকার রাস্তায় কি মাছ আসে এভাবে?
জুয়েল পা দিয়ে পানিগুলোকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করে। তার বুঝি বয়স কমে গেছে।
এমন করে কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ। আচ্ছা একটা তেলাপিয়া যদি মিলতো! বাসায় নিয়ে শিমুর মাকে বলা যেত- বউ মাছটা কড়া করে ভাজো। একটা শুকনা মরিচও ভেজে দিও।
মহিলাটার যতই অসুখে কাবু হোক না কেন, স্বামীর পছন্দের খাবার রান্না করতে সর্বোচ্চ করে। খেতে বসে শিমুর মা বলবে, আরেকটু ভাত দেই! জুয়েল শুরুতে না না করলেও লাজুক হাসি ঠোঁটে এনে বলবে, এখন কি আর এতো খাওয়ার বয়স আছে শিমুর মা!
বৃষ্টি কমেছে। একটা বাসে উঠে জুয়েল। সিটও পেয়ে যায়। সিটে বসে সে নিজেই অবাক ছোট মানুষের মতো ফুটপাতে জমা পানিতে সে কেমন খেলা করলো।
তার ইচ্ছে করছে বৃষ্টিতে ভিজতে। বাস থেকে নেমে যেতে। তার আজ প্রথম মনে হচ্ছে জুয়েল মহাজন নামটা খারাপ না। টুকরো টুকরো সুখ, সাগর সমান দু:খ, আনন্দ বেদনার মহাজন সে।

