বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

জীবনবাদী সাহিত্যসৃজনের বটবৃক্ষ

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৫৬

মৃত্তিকাঘনিষ্ঠ তাম্রাভ মানুষের কথাকার হাসান আজিজুল হক সম্পর্কে প্রচলিত, বহুল ব্যবহৃত বিশেষণগুলোর দিকে একবার ফিরে তাকাতে পারি। তাঁকে বলা হয় গল্পের মানসপুত্র, গল্পের জাদুকর, প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক, নিরীক্ষাধর্মী ভাবদর্শনের গল্পকার। রাঢ় বাংলা থেকে সমতল ও ভাটি বাংলার মাটি ও মানুষের জীবনের চালচিত্র নিয়ে গবেষক। 

মানবাধিকারকর্মী, সমাজচিন্তক, সংস্কৃতিতাত্ত্বিক, মগ্ন চৈতন্যের চিত্রকর, জীবন ঘষে আগুন জ্বালানোর কারিগর। সময় ও সমাজের চিন্তাচেতনার রূপকার। এবং অনুপম আদর্শে ভাস্বর এক আলোকোজ্জ্বল প্রতিভা, শিক্ষাবিদ। তিনি বাঙালির সমাজ দর্শন নিয়ে চিন্তাচর্চা করে আবার সেই ভাবনার সূত্রকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নির্মাণে তাঁর রচনায় মূলত কথাসাহিত্যে ব্যবহারিকভাবে বাঙ্ময় করে তোলেন। 

আমরা লক্ষ করতে পারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার দিকে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছেন এ জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। আর হাসান আজিজুল হক একই জেলার যবগ্রামে। আমাদের সাহিত্যের উজ্জ্বলতম দুই বাতিঘরের আঁতুরঘর একই জেলায়। তাহলে কি বলা যায় সাহিত্যসৃজনে শেকড়ের রসসিঞ্চনী ভূমির শক্তি সঞ্চারিত হয় একই ভৌগোলিক মানুষের জন্মবীজের সংযোগের মধ্য দিয়ে? নাকি কেবলই কাকতালীয় ব্যাপার? উত্তর যাই হোক না কেন বিষয়টি পাঠকদের চমকিত করে। 

হাসান আজিজুল হক।

বারবার আমাদের চোখ ঘুরেফিরে দেখার চেষ্টা করে রাঢ়বঙ্গের বর্ধমান জেলার মানুষের মাটি ও কথ্যভাষার দিকে। অন্তত হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের ভাষাশৈলী আমাদের চিত্রকে টেনে ধরে রাখে ঐ মাটি ও তাম্রাভ মানুষের দিকে।

‘মার্চের পর এপ্রিলের প্রথম দিকে রোদ তীব্র হয়ে ওঠে। অবশ্যি মে-র মাঝামাঝির অবস্থার দিকে রোদ উপভোগ করা যায়। কিন্তু দুপুরে সীসার মতো আকাশের রং মরা মানুষের নিষ্প্রভ ঘোলাটে চোখের কথা মনে করিয়ে দেয়। সন্ধ্যার দিকে সারা গায়ে ধুলো মেখে গাছগুলি বিবর্ণ বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে থাকে। পোড়া তাম্রাভ উঁচুচোয়াল মানুষগুলিকে রাস্তায় ঘুরতে দেখা যায়...’ [বৃত্তায়ন]

১৯৬০ সালে, ২১ বছর বয়সে, রচিত ‘বৃত্তায়ন’ উপন্যাসের এ গদ্যাংশটির স্রষ্টা আজকের মধ্যগগনে দীপ্যমান গদ্যশিল্পী হাসান আজিজুল হক। জীবনকে এমন নির্জল নিরেট অভিবীক্ষণ করার নজির বিশ্বসাহিত্যে বেশি পাওয়া যাবে না। কিন্তু কেন হাসান এমন সৃষ্টিশীল গদ্যটি প্রকাশ করেননি এতদিন, আদতে বলা উচিত, কেন তিনি তেমন (বৃত্তায়ন) আরাধ্য গদ্য আর লেখেননি? আমরা পষ্টাপষ্টি দেখতে পাচ্ছি হাসান তখনো হেগেল-ফয়েররাখ-মার্ক্সকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত নন। তাঁর দৃষ্টির দিগন্তে তারপর এসেছে সামাজিক স্বপ্নের রংধনু। 

হাসান আজিজুল হক।

তাঁর চরিত্রেরা জীবনের কক্ষপথে কঠোর চেতনা ধারণ করেছে। হাসান আজিজুল হক যে কহর কালো ব্রাশ-টান দিয়ে সুহাস ও ফেকুকে মূর্ত করেছিলেন, তেমন শক্তিমান সাদায় স্বাধীনতার জন্য মরণপণ কোনো নবীনকে তিনি এঁকেছেন কি? কিন্তু ইতিহাসকে তিনি যে-ধমক দিয়েছিলেন-ইতিহাসের সেই কালো পর্বের পরিণতিকে নিখুঁত রেখায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন-তারই পটভূমিতে আরেক অত্যুজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমরা রচনা করেছি। আজো ইতিহাস নির্মীয়মাণ। 

আগুনপাখি-কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক রাঢ়বঙ্গে এক প্রবীণ নারীর মুখের কথা শুনে-শুনে বর্ধমানের আঞ্চলিক ভাষায় সাতচল্লিশপূর্ব ইংরেজ-শাসিত ভারতবর্ষের রাজনৈতিক-সামাজিক চিত্র এঁকেছেন শিল্পের দায় মিটিয়ে-এটাই তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এতে আছে বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল, ভয়ংকর মন্বন্তর ও সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসা, ভারতবিভক্তির রেখায়ন। মূলত এক-নারীর জীবন নিয়ে এক-উপন্যাস-একটি পবিরারকে ঘিরে সম্প্রদায়গত, দেশগত রাজনৈতিক-সামাজিক চরিত্র সৃষ্টির এ এক নবতর অভিযোজনা। বাংলাসাহিত্য এক আকর সমাজচিত্র পেয়েছে হাসানের হাত দিয়ে। 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

মঈন ও তার বাইসাইকেল 

‘তোমরা নতুন লেখক তৈরি করো না বাপু’

অন্যের সিলেবাসে চলার দাসত্ব ও আত্মহত্যার দর্শন 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

ফাদার দ্যতিয়েন যেভাবে হয়ে ওঠেন বাঙালির আত্মজন 

জীবন কি ‘পোকা’ হয়ে ওঠারই নাম? 

কবিতা

অভিভূতকর অপেক্ষা