কাস্টমস, এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট বিভাগের সম্ভাব্য দুর্নীতির ১৯টি উত্স চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পাশাপাশি চিহ্নিত এসব উত্স প্রতিরোধে ২৬ দফা সুপারিশ করেছে দুদক। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট নিয়ে দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক দলের প্রতিবেদন থেকে এ সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। দুর্নীতির সম্ভাব্য উত্স এবং তা নিরসনে সুপারিশসংবলিত ওই প্রতিবেদন ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। এর আগে আয়কর বিভাগে দুর্নীতির ১৩টি উত্স চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ২৩ দফা সুপারিশ করছিল দুদক।
দুদক সূত্র জানায়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভিন্ন সংস্থার জন্য দুদকের আলাদা আলাদা দল রয়েছে। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে সংস্থার পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি আছে। কমিটি সমপ্রতি ওই বিভাগের দুর্নীতির উত্স চিহ্নিত করা ও তা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তৈরি করেছে।
কাস্টমস ও এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট বিভাগের চিহ্নিত দুর্নীতির উত্সগুলো হলো-
১. পণ্য আমদানিতে পণ্যমূল্য অবমূল্যায়ন, অতিমূল্যায়ন, পণ্যের বিবরণ, এইচএস কোড, ওজন পরিমাণ, গুণগতমান ইত্যাদি বিষয়ে মিথ্যা ঘোষণা, প্রতারণা এবং একই প্রকার পণ্যের একাধিক চালান প্রস্তুতকরণ ইত্যাদি কাস্টমস হাউজগুলোর ব্যাপক প্রচলিত অনিয়ম।
২. রেয়াত সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন বা এসআরও এর শর্ত অমান্য এবং আমদানি-নীতি, পরিবেশ নীতি, অন্যান্য বিধি-বিধান ও নীতিমালার শর্ত/নির্দেশনা ভঙ্গ করে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে দুর্নীতি করা হয়ে থাকে। ৩. কাস্টমস আইন, ১৯৬৯ এর বিধান অনুসারে আমদানিকৃত পণ্য এবং খালাসকৃত পণ্যের চালানসমূহ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায়শ সমন্বয় করা হলেও নিলামের মাধ্যমে নিষ্পত্তি না হওয়া। ৪. কাস্টমসের জন্য বিশ্বব্যাপী এইসাইকুডা পদ্ধতি চালু থাকলেও বাংলাদেশে কাস্টমস বিভাগ সার্বিকভাবে এখনো এটি চালু করতে পারেনি। যা দুর্নীতির প্রবণতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। ৫. প্রফর্মা ইনভয়েস, বিল অব লেডিং, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট এসব গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি আমদানিকারক বা এজেন্সিগুলো কর্তৃক প্রায়শ যথানিয়মে সঠিকভাবে প্রস্তুত করা হয় না। ৬. কাস্টমস হাউজের বহুবিধ বন্ডসমূহের (শতভাগ রপ্তানি বন্ড/চামড়া খাতের বন্ড/আমদানি বিকল্প বন্ড/কূটনৈতিক বন্ডশিপ/ স্টোরস বন্ড ইত্যাদি) ব্যবস্থাপনা মানসম্মত নয়। ৭. সমজাতীয় বা প্রতিদ্বন্দ্বী পণ্যের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যমূলক ট্যারিফ কাঠামোর কারণে কাস্টমস সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ, বিরোধ বা মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে এবং দুর্নীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ৮. প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থের অপ্রতুলতা (অপর্যাপ্ত ওজন নির্ধারক/স্ক্যানিং মেশিন, সিসি ক্যামেরা, ফর্ক লিফ্ট, সমন্বিত স্বয়ংক্রিয়তা বা অটোমেশন), কাস্টমস এর অন্তঃ ও আন্ত ঃ প্রাতিষ্ঠানিক (ভ্যাট এবং আয়কর বিভাগ, অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে) সমন্বয়ের অভাব, শুল্ক গোয়েন্দা সংস্থার অপর্যাপ্ত ও অদক্ষ তত্পরতা, গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাব এবং পণ্য খালাসের নিরীক্ষা সম্পাদনে অনীহা প্রভৃতি দুর্নীতিকে উত্সাহিত করে। ৯. অস্থায়ী আমদানি বিধির আওতায় বিশেষ সুবিধাভোগী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আমদানিকৃত গাড়ি, লজিস্টিক্স ও অন্যান্য পণ্যাদি, বিলম্বিত শুল্ক ব্যবস্থার আওতায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য আমদানিকৃত অনুরূপ মালামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব এবং এরূপ প্রক্রিয়ায় আমদানিকৃত কোনো কোনো মালামাল পুনঃরপ্তানির ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়ে থাকে।
১০. ভ্যাট আইন ও বিধিমালায় অসঙ্গতি যথা: বিবিধ রেয়াত, মূল্য এবং ট্যারিফের নিম্ন ভিত্তি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ১১. পণ্যের শুল্কায়ন চূড়ান্তভাবে সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট আইনে সাময়িকভাবে শুল্কায়নপূর্বক পণ্য ছাড় দেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে শুল্ক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্য চালান সাময়িকভাবে শুল্কায়নপূর্বক ছাড় দেওয়া হয়। ১২. কাস্টমস হাউজগুলোতে ওজন পরিমাপক যন্ত্র, স্ক্যানিং মেশিন, সিসি ক্যামেরা প্রতিনিয়তই অকেজো থাকে অথবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে অকেজো করে রাখা হয়। ১৩. সিএন্ডএফ এজেন্টদেরকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সঠিকভাবে মনিটরিং না করার ফলে দুর্নীতিবাজ শুল্ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে সিএন্ডএফ এজেন্টেদের অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে উঠে। ১৪. বন্ড কমিশনারেটের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহের নিয়মিত অডিট সম্পন্ন করা হয় না; বিশেষ করে ইউটিলাইজেশন ডিকলারেশন আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সম্পন্ন হয়ে থাকে, যা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে অডিট করে না। ১৫. বন্ড লাইসেন্স প্রদানে এবং নবায়নে দুর্নীতি ঘটে। ১৬. আমদানি রপ্তানিতে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের অংশটুকু ব্যতিরেকে বন্ড ওয়্যারহাউস কার্যক্রমের ব্যস্থাপনা সম্পূর্ণ ম্যানুয়ালি সম্পাদিত হয়। এ পদ্ধতিতে মানসম্পন্ন অডিট সম্পদান করা প্রায় অসম্ভব। যার সুযোগ বন্ড প্রতিষ্ঠান এবং অসাধু কর্মকর্তারা গ্রহণ করে থাকে। ১৭. বর্তমান মূসক ব্যবস্থায় আদর্শ হারে ১৫% হারে মূসক, ট্যারিফ মূল্য ও সংকুচিত মূল্যে মূসক পরিশোধের বিধান রয়েছে। ট্যারিফ মূল্য ও সংকুচিত ভিত্তি মূল্যে পণ্য/সেবা প্রদানকারীর রেয়াত গ্রহণ করতে না পারায় তারা কাঁচামালের ওপর ভ্যাট পরিশোধ হয়েছে কি না-তা যাচাই করে না। ১৮. উেস ভ্যাট কর্তনের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণ রাজস্ব আয়ের ফলে ভ্যাটে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যাপ্ত শ্রম প্রদানের প্রয়োজন হয় না। অন্য দিকে, তাদের লক্ষ্যমাত্রা উেস ভ্যাট কর্তনের মাধ্যমে পরিপূর্ণ হওয়ায় তারা ভ্যাটের পরিধি বাড়িয়ে নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন না করে দুর্নীতির দিকে ঝুঁকে যায়। এ ছাড়া, ভ্যাট কর্মকর্তাদের সাথে অবৈধ যোগসাজশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চালান (মূসক-১১) জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহককে প্রতারিত করার মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। ১৯. শুল্ক ও ভ্যাট আদায় সংক্রান্ত নীতিমালা না থাকা এবং নিয়োগ বদলি ও পদোন্নতিতে সুনির্দিষ্ট গাইডলাইনের অভাবে এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি উত্সাহিত হয়।
