বিক্রির অপেক্ষায় কর্ণফুলীর পাড়ে ২২ বছর পড়ে আছে আরভি মাছরাঙা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩৬

বাংলাদেশের সমুদ্র গবেষণা জাহাজ ‘আরভি মাছরাঙা’ বিকল হওয়ার পর ২২ বছর ধরে বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে আছে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে। অপর গবেষণা জাহাজ ‘আরভি অনুসন্ধানী’ বিকল হওয়ার ১৩ বছর পর বিক্রি হলেও গত প্রায় তিন বছর ধরে নানা জটিলতায় ক্রেতার কাছে তা হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। সরকারি মালিকানাধীন এ দুটি জাহাজই বর্তমানে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে বাংলাদেশ মত্স্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) নদীসংলগ্ন বেসিনে বাঁধা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট সূত্র।

বিকল হয়ে যাওয়ার পর জাহাজগুলো বিক্রি করে ক্রেতাদের হস্তান্তরে এতো দীর্ঘ সময় লাগা প্রসঙ্গে চট্টগ্রামস্থ সামুদ্রিক মত্স্য দপ্তর থেকে বলা হয়, দরপত্র সংক্রান্ত জটিলতাই জাহাজ দুটি বিক্রির ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় নিয়েছে। একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এসব জাহাজ বিক্রির ক্ষেত্রে দরপত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়। প্রতিবার এই নিয়ম অনুসরণ করে  দরপত্র আহ্বান করে দেখা গেছে জাহাজ কিনতে আসা দরপত্রদাতারা সরকারি সংরক্ষিত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দরপত্রে উল্লেখ করছেন। ফলে জাহাজ দুটি সময় মতো বিক্রি করা যায়নি। এইভাবে গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে বিকল গবেষণা জাহাজ আরভি মাছরাঙা এবং আরভি অনুসন্ধানীকে বিক্রির জন্য প্রতিটির ক্ষেত্রে অন্তত ৭ থেকে ৮ বার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং প্রতিবারই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি সরকার নির্ধারিত সংরক্ষিত মূল্যের চেয়ে দরপত্রসমূহে অনেক কম মূল্য দেখে দরপত্রসমূহ বাতিল করে দেন।

ওই কর্মকর্তা জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আরভি মাছরাঙাকে বিক্রির জন্য আবারো দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এই মাসেরই ২৫ ফেব্রুয়ারি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি জমা পড়া দরপত্র নিয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। এবার দরপত্রে সরকার নির্ধারিত সংরক্ষিত মূল্য ধরা হয়েছে ৪০ লক্ষ টাকা। এই মূল্যের উপরে যে দরপত্রদাতা সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য উল্লেখ করবেন জাহাজটি তার কাছেই বিক্রি করা হবে। কর্মকর্তাটি আরো জানান, ২০১৬ সালে বিকল গবেষণা জাহাজ আরভি অনুসন্ধানী দরপত্রের মাধ্যমে ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। কিন্তু জাহাজটি হস্তান্তরের সময় ক্রেতাপক্ষ একটি অযৌক্তিক শর্ত জুড়লে জাহাজটি এখনো হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। ২০১৬ সালে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর জাহাজটি হস্তান্তরের জন্য সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে যথারীতি কার্যাদেশও দেয়া হয়েছিল। সর্বশেষ খবর হচ্ছে জাহাজটির ক্রেতার সাথে জাহাজটি হস্তান্তরে বর্তমানে একটি সমঝোতা প্রক্রিয়া চলছে।

চট্টগ্রামস্থ সামুদ্রিক মত্স্য দপ্তরের অপর একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানান, বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় মত্স্য সম্পদের উপর জরিপ ও গবেষণার জন্য তত্কালিন সরকার ১৯৭৬ সালে আরভি মাছরাঙা জাহাজটি কেনেন। জাহাজটি বিভিন্ন সমুদ্র অভিযানে বঙ্গোপসাগরের মত্স্য সম্পদ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও জরিপও সম্পাদন করে। এই জাহাজটি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ১৯৯৭ সালের জুন মাসে কর্ণফুলী শিপইয়ার্ডের কাছে উত্তর পাড় বরাবর ডুবে গেলে জাহাজটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। জাহাজের ভেতরের মূল্যবান গবেষণা যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যায়। অপরদিকে ১৯৭৯ সালে জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশে সরকার বঙ্গোপসাগরে গবেষণা ও জরিপ পরিচালনার জন্য আরভি অনুসন্ধানী জাহাজটি ক্রয় করে। এই জাহাজটি ২০০৩ সাল পর্যন্ত সাগরে ব্যাপক গবেষণা ও জরিপ কার্যক্রম চালিয়ে অর্থাভাবে, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ২০০৩ সালেই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা জাহাজটি গবেষণা উপযোগী নয় বলে জানায়। ফলে অনুসন্ধানীকেও মাছরাঙার পাশাপাশি নিয়ে আসা হয় কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে বিএফডিসি’র নদীসংলগ্ন বেসিনে। জাহাজ দুটি এতোদিন ধরে সেখানেই রয়েছে। জাহাজ দুটি এক সময় পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশ সামুদ্রিক মত্স্য জরিপ ব্যবস্থাপনা ইউনিট নামের একটি প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে অন্তত আরভি অনুসন্ধানীর রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহে কঠিন আর্থিক সমস্যা হয় বলেও কর্মকর্তাটি জানান। কারণ সরকার থেকে টাকা বরাদ্দ করিয়ে আনা ছিল দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।