মুম্বাই হামলার ১৩ বছর পর

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২১, ০৫:০৯

আজ ২৬ নভেম্বর। আধুনিক ভারতের এক অন্যতম দুঃসহ যন্ত্রণার দিন। ২০০৮ সালের এই দিনে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রাণকেন্দ্র মুম্বাই শহরের ১২টি স্থানে হামলা চালায় পাকিস্তানের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা লস্কর-ই-তৈয়বার ১০ জঙ্গি। সেই আক্রমণে তাৎক্ষণিকভাবে ১৮০ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ দেয় এবং ৩ শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়, যাদের অনেকেই পরে মারা যায় অথবা সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল মুম্বাইয়ের দি তাজমহল প্যালেস হোটেল এবং ওবেরাই ট্রাইডেন্ট হোটেলে হামলা। ৬৪ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় সেই হোটেলের ২০০ জিম্মিকে মুক্ত করতে পেরেছিল ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু মূল্য দিতে হয়েছে অনেক।  

মুম্বাই হামলা নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক বই, হয়েছে অনেক গবেষণা, রয়েছে কনস্পিরেসি থিওরি। এর মধ্যে কয়েকটি বই পড়ার সৌভাগ্য এই নিবন্ধকারের হয়েছে। অনেক আর্টিকেলও পড়তে হয়েছে। তাতে মনে হয়েছে মুম্বাই হামলার পেছনের সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিই সবচেয়ে কম স্থান হয়েছে অর্থাৎ প্রাধান্য পায়নি। আর তা হলো, ভারত তথা ভারতে বসবাসরত নেটিভ জনগোষ্ঠীর প্রতি শত শত বছরের ঘৃণার বহিঃপ্রকাশের মাত্রা।

আধুনিক সময়ে মুম্বাই হামলাই কিন্তু প্রথম বা শেষ হামলা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলার অনেক আগেই ভারতে আক্রমণ শুরু হয়েছে। এই মুম্বাইতেই ১৯৯৩ সালে, ঠিক বাবরি মসজিদসংক্রান্ত দাঙ্গার পর এক বিশাল সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। তাতে ২৫৭ জন মানুষ সরাসরি মৃত্যুবরণ করে এবং দেড় হাজার মানুষ আহত হয়। আদালতে প্রমাণ হয়েছে, এই হামলা সংঘটন করে দাউদ ইব্রাহীমের মদদে টাইগার মেনন ও ইয়াকুব মেনন। যদিও ভারতের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে সংক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠীও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে; কিন্তু সত্য হলো, সর্বাধিক সংখ্যক হামলা সংঘটিত হয়েছে মুসলিম চরমপন্থি বা জঙ্গিদের দ্বারা। আর এর প্রায় প্রত্যেকটি হামলার পেছনে রয়েছে প্রতিবেশি পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ হাত। অর্থাৎ, এই ঘৃণার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে পাকিস্তান আর প্রজেক্টাইলের মতো তার সমাপ্তি ঘটছে ভারতে আছড়ে পড়ে, বিধ্বংসী রূপ নিয়ে। কেন এই হামলা তার ইতিহাস খুব অস্পষ্ট নয়। অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ চেয়েছিলেন ধর্মভিত্তিক একটি রাষ্ট্র, পক্ষান্তরে ভারত চেয়েছিল একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র তৈরি করতে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভ্রান্ত দ্বিজাতিতত্বের আস্ফালনে ভারতবর্ষের বিশাল সংখ্যক মুসলিম জনগোষ্ঠী আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। 

গান্ধী-নেহেরুর এক ভারত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সৃষ্টি হয় হাজার মাইলের ব্যবধানের দুটি ভূখণ্ড নিয়ে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান। যেহেতু পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ধর্মসর্বস্ব এবং ধর্মাচ্ছন্ন। তাই কাশ্মীর তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কাশ্মীরের তৎকালীন শাসক মহারাজা হরি সিং যে স্বাধীন রাষ্ট্র চেয়েছিলেন তা পশতুনরা তথা পাকিস্তান আক্রমণ করে অনেকটা অংশ দখল করে নেয়। হরি সিং বিপদের মুখে সাহায্য প্রার্থনা করলে তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন শর্তসাপেক্ষে কাশ্মির রক্ষায় এগিয়ে যান। সে ইতিহাস অনেক বিস্তৃত, অনেক বিস্তারিত আলোচনার বিষয়। ছোট নিবন্ধে তা উল্লেখ অসম্ভব। কিন্তু সেই শুরু। পাক ভারত দ্বন্দ্বের অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়ায় কাশ্মীর। আর শুরুর মতোই এখনো ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকেই পুঁজি করে প্রতিনিয়ত চলছে কাশ্মীরে জঙ্গি হামলা। অর্থাৎ আজমল কাসাভ, ডেভিড হেডলি তথা দাউদ সাঈদ গিলানি (যুক্তরাষ্ট্রে মুম্বাই হামলার দায়ে ৩৫ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত) থেকে শুরু করে আমির রিয়াজ বা সিরাজ মোলভি এবং পাকিস্তানের আইএসআই বা সেনাবাহিনী একই সূত্রে গাঁথা।

একথা ঠিক, মুম্বাই হামলার পর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি (প্রকাশ থাকে, দাউদ সাঈদ গিলানির সৎভাই দানিয়াল গিলানি প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির মুখপাত্র হিসাবে কর্মরত ছিলেন) এবং প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদানি তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন এবং সার্বিক সহযোগিতার কথা বলেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের ট্যাজেডি হলো, সেখানে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী সর্বদাই সেনাবাহিনীর হাতের ক্রীড়নক মাত্র। এটি সেই ৫০ এর দশকের শুরু থেকেই পাকিস্তানের রাজনীতির কালচার। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সিদ্ধান্ত সর্বদাই নিয়ন্ত্রণ করে সেনাবাহিনী ও আইএসআই। আর এই ক্ষমতা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রকাশ্যে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। লস্কর-ই-তৈয়বা, জৈশ-ই-মোহাম্মদ, হিজবুল মুজাহিদীন, আল-বদর এবং টিআরএফের মতো জঙ্গী সংগঠনগুলোকে আজও তারা ব্যবহার করে চলেছে।  

শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরেই নয়, ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তৎপরতায় পাকিস্তানের সোর্সগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে আছে। ২০০৯ সালে পাকিস্তানের নাগরিক জাভেদ ইকবাল এবং হামাদ আমিন সাদিককে গ্রেফতার করা হয়। দুই পাকিস্তানিকে সন্ত্রাসী হামলায় অর্থায়নের দায়ে ইতালির মিলান থেকে ২০০৯ সালের নভেম্বরে গ্রেফতার করে ইতালির পুলিশ। যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই ২০০৯ সালেই ডেভিড হেডলি বা দাউদ সাঈদ গিলানি এবং তাহাউর হোসেন রানাকে গ্রেফতার করে। দুঃখের বিষয়, তদন্তের সময় এও বের হয়ে আসে যে, গিলানির সঙ্গে বাংলাদেশের জঙ্গিগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে।  অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে আপাতত তারা গর্তে লুকিয়ে থাকলেও তাদের অস্তিত্ব একেবারে বিলীন হয়ে যায় নাই। একথা সকলকে স্মরণে রাখতে হবে। 

কিন্তু এইভাবে তো পৃথিবী চলতে পারে না। এর একটি ব্যত্যয় প্রয়োজন। তিক্ত ইতিহাসকে দূরে ঠেলে দিয়ে একটি নিরাপদ, সহযোগিতামূলক সম্পর্ক প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। তা না হলে এই জনবহুল দেশগুলিকে অর্থনৈতিকভাবে, জীবনযাত্রায়, সামাজিক নিরাপত্তায় যোজন যোজন মাইল পেছনেই পড়ে থাকতে হবে। মুশকিল হলো, সেই বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? 

বরং অশুভ শক্তির বিস্তার বেড়েই চলেছে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির পথ আরো সরু হয়ে আসছে। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো ভারত-পাকিস্তানের মতো দেশগুলিকে বাধ্য করছে সামরিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধি করতে। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, যখনই পাকিস্তান ও ভারতের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একটি সুসম্পর্ক তৈরিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে, তখনই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে সে দেশের মিলিটারি। হয়তো অস্ত্রের ব্যবসা করা রাষ্ট্রগুলোও চায় না ভারত পাকিস্তানের মধ্যে নিবিড় কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক। কিন্তু বাস্তবতা হলো এটাই যে, উস্কানি মুখ্যত পাকিস্তানের একটি শক্তিশালী মহল থেকেই আসছে। সেটা বিগত দিনের মতো আজও সত্য।  কাশ্মীর প্রশ্নে ১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯ সালে তিনটি বড় যুদ্ধ হয়ে গেছে দুই দেশের মধ্যে। ২০০৩ সালে দুই দেশের মধ্যে লাইন অফ কন্ট্রোল প্রশ্নে একটি যুদ্ধ বিরতি চুক্তিও হয়। কিন্তু ২০২৬ সাল থেকেই অব্যাহতভাবে চলছে লাইন অফ কন্ট্রোলে বিচ্ছিন্ন হামলা। 

২০১৪ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নেওয়াজ শরিফকে আমন্ত্রণ জানান তার অভিষেকে। তখন আশা করা হয়েছিল যে, একটি ফলপ্রসূ আলোচনা হবে। কিন্তু এমন একটি পরিবেশের মধ্যেই ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাই কমিশনার কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে স্বভাবতই সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের সময় আবার একটি আবহ তৈরি হয়েছিল একটি সমঝোতার। এর ওপর ভিত্তি করেই ব্যাংককে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যুতে একটি ইতিবাচক আলোচনা হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অকস্মাৎ লাহোরে সংক্ষিপ্ত সফরে গিয়ে সবাইকে অবাক করে দেন। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফের মাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেন এবং প্রধানমন্ত্রী শরীফের মা প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আশীর্বাদ করেন। পরিবেশ যখন এমন হয়ে উঠছিল তখন হঠাৎ করেই ভারতেই উরিতে অবস্থিত একটি সেনাঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলা চালায় জৈশ-ই-মোহাম্মদ নামের জঙ্গি সংগঠন। সেই হামলায় ১৮ জন ভারতীয় সেনা প্রাণ হারান। ভারত ও বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দারা রিপোর্ট করেন, জৈশ-ই-মোহাম্মদের ওই হামলা সংঘটিত হয় পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিস ইন্টেলিজেন্স। সুতরাং শান্তি ও সমঝোতার রশিটির শেষ প্রান্ত কোথায় তা ভেবে দেখতে হবে। 

লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক 

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন