জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছেন। গত সোমবার রাতে তার বিতর্কিত কথোপকথনের ১ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের একটি অডিও রেকর্ড ভাইরাল হলে তার শাস্তির দাবিতে ফুসে উঠেছে রাজশাহীর মানুষ। সেই রেকর্ডে তার নিজের জবানিতেই দৈনিক লাখ লাখ টাকা ইনকামের স্বীকারোক্তি আছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের শেষের দিকের আলোচনার কিছু অংশের অডিও রেকর্ড এটি, যা ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। তবে এই অডিও সম্পর্কে আব্বাসের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত আগস্টের মাঝামাঝিতে নিজ দপ্তরে ব্যবসায়ীদের নিয়ে ঐ বৈঠক করেন মেয়র আব্বাস। সরকারি নালার ওপর দোকান নির্মাণের উদ্দেশ্যেই ঐ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সূত্র মতে, বৈঠক শেষ হলেও বৃষ্টিতে আটকে পড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন মেয়র। ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপটি এরই অংশ বিশেষ। সেখানে মেয়র আব্বাসকে নিজের বিপুল আয়ের বিবরণ দিতে শোনা যায়। অডিও ক্লিপের এই অংশটিও ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের হাতে হাতে। আব্বাস আলীকে বলতে শোনা যায়, ‘বাড়ি করতে গিয়ে মাটির তলেই তো ১ কোটি টাকা চলে গেছে। একটা মানুষের কত টাকাই বা আর লিকুইড মানি থাকে?’ এ সময় তার আশপাশে থাকা লোকজন তার প্রশংসা করে বলেন, ‘রাজশাহীর মধ্যে আপনার বাড়িটা সবচেয়ে ভালো করতে হবে’।
ঐ কথার পিঠে আব্বাস বলেন, ‘গতবার বালুর ঘাট ৬ কোটি টাকায় ইজারা নিয়েছিলাম চার জন মিলে। সেখানে মোট আয় হয়েছিল ১৯ থেকে ২০ কোটি টাকা। এবার ১০ কোটি টাকায় নিয়েছি। সেখানে আমার শেয়ার ৩০ শতাংশ। সে অনুযায়ী প্রতিদিন ঘাট থেকে আমার ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আয় হয়।’খড়খড়ি হাট বাত্সরিক ৪০ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন উল্লেখ করে আব্বাস আলী বলেন, ‘ঐ হাট আগে মাত্র ৩০ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হতো। সেখান থেকে প্রতিদিন তিনি ১ লাখ টাকার কিছু বেশি আয় করেন। তবে এখন প্রতিকূল মৌসুমে আয় কিছুটা কম। এই এক-দুই মাস পর বেলঘড়িয়া রোডে আমার যে মার্কেট আছে, তার কাজ কমপ্লিট হয়ে গেলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’
অপসারণ ও গ্রেফতার দাবি
এদিকে, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল করা ‘পাপ হবে’ এমন বক্তব্যের অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীর বিরুদ্ধে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার অভিযোগে তার বহিষ্কার, মেয়র পদ থেকে অপসারণ, গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রতিনিধিরা। মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলাও হয়েছে। তাকে কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়কের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার রাতে মেয়রের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে তিনটি মামলার আবেদন করা হলেও এর মধ্যে একটি বুধবার রাতে মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছে পুলিশ। একই অভিযোগের জন্য অন্য দুটি মামলা রেকর্ড হয়নি। এর আগে দুটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। বলা হচ্ছে অডিও দুটির কথোপকথন আব্বাসের। একটি অডিওতে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ করলে ‘পাপ হবে’ এমন কথা বলতে শোনা যায়। অন্যটিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের সমালোচনা করা হয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার আব্বাসের শাস্তির দাবিতে মাঠে নামে মহানগর আওয়ামী লীগ, কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগ, সাবেক ছাত্রলীগ ফোরাম, জেলা ও মহানগর যুবলীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ, জেলা আওয়ামী লীগ, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন। দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে মেয়র আব্বাসকে দল ও মেয়রের পদ থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ। এছাড়া ছাত্রমৈত্রীর জেলা ও মহানগর প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ করেছে। দুপুরে বিক্ষোভ চলাকালে কয়েক জন নেতাকর্মী কাটাখালী বাজারের ‘আব্বাস চত্বর’-এ ভাঙচুরের চেষ্টা চালায়।
এদিকে জানা গেছে, অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছেন মেয়র আব্বাস আলী। তিনি অফিস করছেন না। মোবাইল ফোনও বন্ধ। তার কয়েক জন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও জানা যায়নি আব্বাস আলী এখন কোথায় আছেন। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে আব্বাস আলী বলেছেন, ‘অডিওটি এডিট করা। এসব কথা তিনি কাউকে বলেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করেন।’
