মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

সুন্দর জীবনের খোঁজে

প্রকাশ : আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২১, ০৯:২৬

জীবনে কী করতে ইচ্ছুক—এরকম একটা প্রশ্ন করা হলে কী উত্তর দেবেন আপনি? আমেরিকায় একদল গবেষক এই প্রশ্নটা করেছিলেন বেশ কিছু যুবককে। তাঁদের আশি ভাগের জবাব ছিল—তাঁরা সবাই বিরাট ধনী হতে চান। আর পঞ্চাশ ভাগ একইসঙ্গে বিখ্যাত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন—সেই আমলের রকফেলার বা হালের বিল গেটস বা এলন মাস্ক-এর মতো।

আমাদের অনেকের চিন্তাও অনেকটা এমনই হয়তো। কিন্তু ভাবুন তো একবার—জীবনে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে আসার পরে, আপনার দাদা-নানার মতন কেউ একজন, যিনি আশি বছর পার হয়ে এসেছেন, তাঁর কাছে যদি জানতে চান, জীবনে সব থেকে কী বেশি প্রয়োজন? তাঁদের উত্তর কী হতে পারে! অথবা ধরুন, একজন মানুষ সারা জীবন কী করছেন, অথবা কী খুঁজছেন, তা কেউ দূর থেকে দেখতে থাকল। ঠিক ছেলেবেলায় দেখা রহস্যের দ্বীপ উপন্যাসের ক্যাপ্টেন নিমোর মতো! কেমন একটা গল্প হবে?

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক ঠিক এই কাজটাই করেছেন। বিগত আশি বছর ধরে। সেই গবেষণা থেকে আমরা দুটো কাহিনী বেছে নিতে পারি। এগুলো সত্যিকার মানুষের জীবনের।

কেইস নম্বর ১৪১ : তাঁর জন্ম হয়েছিল এক বিরাট শহরে। স্বনামধন্য চিকিত্সক বাবার প্রাসাদোপম বাড়িতে। বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ডে পড়ার সময় তিনি ছিলেন অত্যুজ্জ্বল, মিশুক আর চমত্কার স্বাস্থ্যের অধিকারী। বন্ধুরা তাঁকে হিংসাও করতেন কিছুটা। হার্ভার্ডের পড়া শেষে পছন্দের চাকরি নিলেন। করলেন বিয়ে। একত্রিশ বছর বয়সে। জীবনটা খুব ছন্দময় আর নিয়ন্ত্রণেই ছিল।

মধ্য ত্রিশের পর কী হলো হঠাৎ! শোনা গেল, তিনি এক অদ্ভুত নারীর প্রেমে পড়েছেন। অ্যালকোহল ধরেছেন। এরপর থেকে কেবল পতনের শব্দ। গ্রান্ট স্টাডি টিমের প্রধান ড. ভ্যালিয়েন্ট তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেন। এবং ব্যর্থ হলেন। মাত্র ৪৭ বছর বয়সে সকল সম্ভাবনাপূর্ণ একজন চমৎকার হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা গেলেন।

কেইস নম্বর ২১৮ : ভদ্রলোক তাঁর আশি বছর উদযাপন করেছেন বেশ কিছুদিন আগে। এখনো বেশ শক্তপোক্ত। সদা-হাস্যোজ্জ্বল। এর মধ্যে ষাট বছর হয়, একমাত্র স্ত্রীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে। জানতে চাওয়া হয়েছিল তাঁর কাছে, জীবনের পথে পিছন ফিরে দেখে কোনো কিছু কি বদলাতে ইচ্ছে হয়? তিনি বললেন, কিছুই না। যা আছে, তাই নিয়েই আমি সুখী।

উনিশ শ ত্রিশের দশকে বোস্টনে দরিদ্র লোকেদের আবাস ছিল ভালোই। এরকমই এক দরিদ্র পরিবারে তাঁর জন্ম। অথচ যাপিতজীবনের বিচারের নিক্তিতে তিনি ভীষণ সুখী। এইরকম ৭২৪ জন মানুষের পুরো জীবনের গল্প নিয়ে একটা অদ্ভুত গবেষণা। বলা হয়, মানুষের জীবন নিয়ে সব থেকে বেশি সময় ধরে চলা একক গবেষণা এটি। নাম হার্ভার্ড গ্রান্ট স্টাডি। আশি বছর হলো, গবেষক টিমের সদস্যরা এঁদের অনুসরণ করছেন। শুরু হয়েছিল ১৯৩৮ সালে। হার্ভার্ডে পড়া ২৬৮ জন সমাজের সম্মুখসারির কিশোর ছিলেন এক দলে। অন্য দলে ছিলেন বোস্টন শহরের সুবিধাবঞ্চিত ৪৫৬ জন বালক। আজ তাঁদের অধিকাংশই মৃত। তাঁদের মধ্যে ষাট জনের মতো বেঁচে আছেন আজ নব্বই বছর। এদের ভেতর কেউ খুব সফল হয়েছেন। সফল ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, নামজাদা লেখক। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। জন এফ কেনেডি।

আবার কেউ কেউ উলটো দিকে গেছেন। মাদকাসক্ত হয়েছেন। হয়েছেন সংসারত্যাগী, বন্ধুহীন। আর অসহায়। তাঁদের জীবন নিয়ে হাজার হাজার পাতার তথ্য লেখা হয়েছে। তাঁদের রক্তের পরীক্ষার রিপোর্ট, মাথার খুলির স্ক্যান রিপোর্ট থেকে বন্ধুদের তালিকা, অবসরের জীবন, সন্তানের মূল্যায়ন। সবকিছুই আছে। এইসব গল্পগাথা ঘেঁটে সব থেকে মূল্যবান প্রাপ্তি হলো, ভালো সম্পর্কগুলো আমাদের সুস্বাস্থ্য এনে দেয়। আর দেয় অপার্থিব সুখ। আমরা পাই একটা চমৎকার জীবন।

এবং তিনটি শিক্ষা : ১. জীবনের সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট সময় রেখায় দেখে পরিমাপ করা যায় না। একটা সফলতা পেয়েই আনন্দিত হবার সুযোগ কোথায়? কেউ একজন খুব ভালো ছাত্র। কিন্তু পড়াশোনা শেষের আগেই ঝরে গেল। অথবা একজন খুব ক্যারিয়ারিস্ট। প্রথম জীবনে সফলতা ছিল। কিন্তু কোথাও থিতু হতে পারলেন না। এই শাখা ঐ শাখা ঘুরে হয়রান হয়ে শেষে ভ্যাগাবন্ড হলেন। অথবা আরেকজন প্রফেশনে খুব সফল মানুষ। কিন্তু পারিবারিক জীবন বিষাদময়। তিনি কতটা সুখী বলে দাবি করতে পারবেন নিজেকে?

একজন মানুষ সফল কি না, এই বিবেচনা করতে গেলে গোটা জীবনের শেষে মাপাটাই শ্রেয়।

২. সংবেদনশীল বুদ্ধিমত্তা খুব গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। জীবনের পথে আপনাকে অগণিত চড়াই-উতরাই পার হতে হবে। দুঃখ, বেদনা সমুদ্রতটে ঢেউয়ের মতন আছড়ে পড়বে। কিন্তু আপনাকে ক্ষত মুছে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আমাদের শরীরে কোথাও কেটে গেলে রক্তপাত হয়। আমরা তা ব্যান্ডেজ করি। রক্তপাত বন্ধ হয়। কিন্তু ব্যান্ডেজ না করলে কী হবে? আমরা হয়তো মরে যাব। বিপুল রক্তপাতে। তেমনি একটা আঘাত এলে ক্ষতে প্রলেপ দিতে হয়। পরের উপকারে মন দিতে হয়। না করলেও চলত, অন্যের এমন একটা উপকারী কাজ যেদিন আপনি করেন, সেদিন একটু বেশি আনন্দ অনুভূত হয় নাকি? এইসব স্মৃতি আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে আরাম দেয়। আর থাকতে হয় কৌতুকপ্রবণ মন।

৩. সম্পর্ক, সম্পর্ক, সম্পর্ক : এই পরীক্ষাটা শুরুর কালে কেউ ভাবেননি, পারস্পরিক সম্পর্ক এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অনেক দিন পার হবার পর গবেষকরা দেখলেন, সুখী হবার পেছনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো সম্পর্ক। একাকিত্ব মানুষের জীবনকে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আপনি বিষাদের ভার বয়ে চলেছেন। বলতে পারছেন না কাউকে। এর থেকে বোঝা আর কিছু হয় না। এরকম একাকিত্ব কেবল স্বাস্থ্যহানি করে না, মানসিকভাবেও পঙ্গু করে তোলে। তাই বলে আপনাকে অনেক মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক রাখতে হবে, এমন নয়। মানুষ ভিড়ের মধ্যেও একা হতে পারে। বরং একজন মানুষও যদি আপনার থাকে, যে সবকিছুতে আপনাকে আগলে রাখবে, সবকিছুতেই আনন্দে রাখবে, বেদনার গাঢ় বিষাদ মুছিয়ে দেবে, তবেও যথেষ্ট। যে কি না ঘোর অমানিশায় কাঁধে আলতো করে হাতটা ছুঁইয়ে অনুভবে বলবে, পাশেই আছি। এমন সম্পর্ক প্রয়োজন। 

আর সবকিছুর আগে পরিবার। আপনি সারা দিন রাজা-উজির খতম করলেন। বিরাট আনন্দ-ফুর্তি করলেন ইয়ার দোস্তদের মহলে। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে দেখলেন, গিন্নি প্যাঁচার মতন মুখ ব্যাজার করে বসে আছেন। মুখ ঝামটা দিয়ে খোঁটা দিলেন একটা। রাতে আর ঘুম কি হবে? হবে না। কাজেই পরিবারের দিকে নজর দিন।

আবার গিন্নির কথাও উলটো করে বলা যায়। কর্তার স্বাস্থ্যের নজর দিন। অন্যের বাড়ির সাজানো সংসার দেখেন। কিন্তু হাঁড়ির ঠোকাঠুকি তো দেখতে পান না।

পৃথিবীর সব কর্তা বিল গেটস-এর মতন অথবা সকল মুশকিলের আসান হবেন না। তাঁরা কেন তেমনটি হলেন না, এই নিয়ে বাহাস না করে, বরং সীমাবদ্ধতায় সুখী হবার চেষ্টা করুন। তবেই দেখবেন—আনন্দম, আনন্দম, আনন্দম।

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

অণুগল্প

চাইছি তোমার বন্ধুতা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

চাইছি তোমার বন্ধুতা

কবিতা

নজরটিপ