জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার মতো অক্সিজেন নেই ময়ূর নদে

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৪:৩৬

খুলনা মহানগরীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া ‘ময়ূর নদ’ দখলমুক্ত হলেও দূষণমুক্ত করার বিষয়ে কোনো তৎপরতা নেই। গত দুই বছরে নদ দখল করে নতুন কোনো স্থাপনা গড়ে না তোলা হলেও ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল, সেগুলোও খননও হয়নি। তাছাড়া বছরখানেক আগে থেকেই এই নদে জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার মতো দ্রবীভূত অক্সিজেন নেই। ফলে নদ দখলমুক্ত করার সঙ্গে প্রাণ ফিরিয়ে আনার যে দাবি উঠেছিল, তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

ময়ূর নদ দখলমুক্ত করার কার্যক্রম শুরু করে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযান চলে ডিসেম্বর পর্যন্ত। ঐ চার মাসে প্রায় ৩৮২টি ছোট-বড় অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। নদ দখলমুক্ত করতে নানা কার্যক্রম চললেও দূষণমুক্ত করার বিষয়ে কোনো তৎপরতা নেই। বছরখানেক আগে থেকেই এই নদে জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার মতো দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) নেই। মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার ২০টিরও বেশি ডোবা-নালার বর্জ্য নদে এসে পড়ছে। এতে পানির রং হয়েছে কুচকুচে কালো। কচুরিপানায় পরিপূর্ণ নদ দেখে বোঝার উপায় নেই, ৫০ বছর আগে এখানে বড় নৌযান চলাচল করত।

ময়ূর নদের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়—নদের পুরোটাই কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। যেখানে কচুরিপানা নেই, সেখানে ভেসে আছে ময়লা-আবর্জনা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মহানগরীর বিভিন্ন এলাকার ছোট-বড় ২০টি ড্রেন ময়ূর নদে এসে পড়েছে। প্রতিনিয়ত এসব ড্রেনের মাধ্যমে নগরীর ভেতরের এসব বর্জ্য সরাসরি নদে এসে পড়ছে। এর পাশাপাশি নগরীর গল্লামারী এলাকার কসাইখানা, বাজারের বর্জ্য, তীরের বিভিন্ন খামারের বর্জ্য সরাসরি নদে পড়ছে।

কেসিসির দেওয়া তথ্য মতে, ময়ূর নদের অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করতে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসন, কেসিসি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে তিন মাস জরিপ করে ময়ূর নদ ও সংলগ্ন ২৬টি খাল দখল করে নির্মাণ করা ৩৮২টি অবৈধ স্থাপনার তালিকা চূড়ান্ত করে।

৪৬০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব স্থাপনা এবং নদের জমি দখল করে রেখেছিলেন। ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। ডিসেম্বর মাসের মধ্যে একাধিক বহুতল ভবনসহ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করে কেসিসি।

অন্যদিকে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ময়ূর নদকে বাঁচাতে খুলনার পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চ নদী কমিশনের চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি প্রেরণ করে। প্রেরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘খুলনা মহানগরীর পশ্চিম কোল ঘেঁষে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী ময়ূর নদ। বটিয়াঘাটা থানাস্থ রূপসা নদী থেকে হাতিয়া নদী নামে উৎপত্তি হয়ে পুটিমারী ও তেঁতুলতলা গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গল্লামারী  সেতু থেকে মূলত ময়ূর নদী নামে শুরু হয়। এর  দৈর্ঘ্য ১১.৪২ কিলোমিটার (কমবেশি), প্রস্থ স্থান ভেদে ৩০ থেকে ১১০ ফুট এবং গভীরতা স্থান ভেদে ১০ থেকে ২৪ ফুট। আগে ঐতিহ্যবাহী ময়ূর নদী একসময় এখানকার মানুষের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মূল ভূমিকা পালনকারী এই নদী ছিল এ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। নৌকা-ট্রলারযোগে সুন্দরবন থেকে আনা গোলপাতা, গরানসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি এই নদী থেকে শহরে সরবরাহ করা হতো। নদীর আশপাশে বসবাসকারী মানুষেরা এই নদীর দ্বারা বেশি উপকৃত হতো। চাষাবাদের কাজে এই নদীর পানি ব্যবহৃত হতো। ফলে অধিকহারে ধানের ফলন এবং রবিশস্যের চাষ হতো। যা এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বিরাট প্রভাব ফেলত। নদীর দুই পাশে অসংখ্য ঝুলন্ত পায়খানা নদীটি ব্যবহারের অযোগ্য করে তুলেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত স্লুইস গেটটি প্রায় অকার্যকর। এটি সচল থাকলেও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, তদারকির অভাব এবং দায়িত্বশীলদের অসততার কারণে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। নদীর দুই পাড়ের ময়লা-আবর্জনায় নদীর গভীরতা আগের তুলনায় অর্ধেকে এসে পৌঁছেছে। পানি পচে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে।’

খুলনার পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের আহবায়ক অ্যাডভোকেট কুদরৎ ই খুদা বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ময়ূর নদকে দূষণ মুক্ত ও খনন করা। কিন্তু সঠিকভাবে এ কাজটি আজও করা হয়নি। কিছু কিছু বাজেট হয় কিন্তু সঠিকভাবে কাজ হয় না।  এই নদটিকে সংরক্ষণ করা গেলে এর পানি দিয়ে ওয়াসা নগরীর পানির চাহিদা পূরণ করতে পারত, কিন্তু তার কিছুই হয়নি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (ডিও) মাত্রা প্রতি লিটারে ছয় মিলিগ্রামের নিচে নেমে গেলে ছোট মাছ বাঁচে না। ময়ূর নদে বছরের বেশির ভাগ সময়ই ডিও শূন্যের কোঠায় থাকে।

নদ দখল উচ্ছেদ কমিটির সদস্যসচিব ও কেসিসির বৈষয়িক কর্মকর্তা নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, প্রতি সপ্তাহে আমাদের লোকজন ময়ূর নদ পরিদর্শন করে। কেউ দখলের চেষ্টা চালালে উচ্ছেদ এবং থানায় ধরে আনা হয়। গত দেড় বছরে নতুন করে কেউ নদ দখল করেনি।

কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবদুল আজিজ বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদসহ কয়েকটি খাল পুনরায় খনন করা হবে। আগামী বছর এ কাজ শুরু হবে।

ইত্তেফাক/এমআর