করোনার নতুন ধরণ শনাক্ত, বিশ্ব জুড়ে সতর্কতা

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৯:২২

আবারও রূপ বদলালো প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস। দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনা ভাইরাসের নতুন একটি ধরন শনাক্ত হয়েছে। একে আপাতত বি.১.১.৫২৯ বলা হচ্ছে। এটি মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এটিই এখন পর্যন্ত দেখা করোনার সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরন। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেদ করে দ্রুত ছড়াতে পারে ধরনটি। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চিন্তিত বিজ্ঞানীরা। এই ভ্যারিয়েন্টটি ব্যাপকভাবে মিউটেট (আচরণ পরিবর্তন) করেছে। করোনার নতুন এই ধরন নিয়ে বিশ্বজুড়েই সৃষ্টি হয়েছে সতর্কতা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), ব্রিটেন ও ভারত বিমানবন্দর ও সীমান্তে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ঘোষণা করেছে। ইতিমধ্যে আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে ফ্লাইট বাতিল করেছে কয়েকটি দেশ। বাংলাদেশেও একই ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, আগেই প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। আফ্রিকার কোন দেশ থেকে কেউ যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে। নতুন ধরনের ভয়ঙ্কর এই ভাইরাস একবার দেশে প্রবেশ করলে আশঙ্কাজনক হারে সংক্রমণ বাড়তে পারে। এদিকে করোনার নতুন ধরন নিয়ে উদ্বেগের জেরে শুক্রবার জরুরি বৈঠকে বসছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সেখানে এই ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে আলোচনা এবং এর নতুন একটি নাম দেওয়া হবে। দ্রুতই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটির গ্রীক নাম (আলফা,  ডেল্টা) নির্দিষ্ট করবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের সংক্রামক রোগ বিষয়ক সংস্থা ইমপেরিয়াল ডিপার্টমেন্ট অব ইনফেকশাস ডিজিজের একজন ভাইরোলজিস্ট নতুন এই ভ্যারিয়েন্টকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে খারাপ ধরণ’ বলে বর্ণনা করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সেন্টার ফর এপিডেমিক রেসপন্স অ্যান্ড ইনোভেশনের পরিচালক টুলিও ডি অলিভিয়েরা বলেন, ‘এই ভ্যারিয়েন্টের মিউটেশনের ধারা অস্বাভাবিক এবং অন্যান্য ভ্যারিয়েন্ট থেকে এটি অনেক ভিন্ন।’ তিনি বলেন, এই ভ্যারিয়েন্ট আমাদের অবাক করেছে। বিবর্তনের হিসেবে এবং পরবর্তী মিউটেশনের হিসেব করলে এটি কয়েক ধাপ লাফ দিয়েছে। করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টে সব মিলিয়ে ৫০টি মিউটেশন রয়েছে যার মধ্যে ৩০টি মিউটেশনই স্পাইক প্রোটিনে। অধিকাংশ টিকাই স্পাইক প্রোটিনের এই ভ্যারিয়েন্টগুলোকে আক্রমণ করে। ভাইরাসের যে অংশটি- রিসিপটর বাইন্ডিং ডোমেইন- আমাদের শরীরের কোষের সাথে প্রথম সংযোগ ঘটায়, নুতন ভ্যারিয়েন্টে সেটির ১০টি মিউটেশন রয়েছে। ভয়াবহ ক্ষতিকর হিসেবে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে এই মিউটেশন ছিল মাত্র দুটি। অনেকগুলো মিউটেশন থাকা মানেই যে সেটি ক্ষতিকর, তা নয়। কিন্তু মিউটেশনগুলো আসলে কী ক্ষতি করছে- তা জানা জরুরি।

চিন্তার বিষয় হলো, চীনের উহানে উদ্ভূত ধরণের চেয়ে এটি অনেক ভিন্ন। এর অর্থ হলো, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে তৈরি হওয়া টিকা- যেগুলো মূল ধরণটি ব্যবহার করে বানানো হয়েছিল, নতুন ধরণের জন্য সেটি সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। ল্যাবরেটরিতে  বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় গবেষণার মাধ্যমে নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে আরো পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাবে কিন্তু প্রকৃতিতে এই ভাইরাস কেমন আচরণ করে, তা পর্যবেক্ষণ করলে আরো দ্রুত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকার গওতেং প্রদেশে এখন পর্যন্ত ৭৭ জনের মধ্যে নিশ্চিতভাবে এই ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া বতসোয়ানায় চার জন এবং হংকংয়ে এক জন এই ভ্যারিয়েন্টে সংক্রমিত হয়েছেন। পরীক্ষায় এই ভ্যারিয়েন্টটি কিছুটা অদ্ভুত ফল দেয় (এস-জিন ড্রপ আউট নামে পরিচিত) এবং তার মাধ্যমে এই ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণের ধারা অনুসরণ করা সম্ভব। তাই ধারণা করা হচ্ছে, গওতেং প্রদেশের ৯০ ভাগ কেসই আসলে এই ভ্যারিয়েন্ট এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অধিকাংশ প্রদেশেই এর উপস্থিতি রয়েছে।

করোনার নতুন ধরণের প্রেক্ষিতে দক্ষিণ আফ্রিকা ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ফ্লাইট বাতিল করেছে ব্রিটেন। একই সঙ্গে ওই দেশগুলো থেকে আসা ব্রিটিশ ভ্রমণকারীদের কোয়ারেন্টাইনে থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডের লিয়েন বলেন, আফ্রিকা অঞ্চলের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, আফ্রিকায় শনাক্ত করোনার ভাইরাসের নতুন ওই ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা আগে থেকেই গ্রহণ করতে হবে। এই ভ্যারিয়েন্ট দেশে প্রবেশ করলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে টিকা কাজ নাও করতে পারে। তাই এখনই সতর্ক হতে হবে। বিমানবন্দর ও সীমান্তে নজরদারি বাড়তে হবে। যদি কেউ প্রবেশ করে তাহলে তাকে কোয়ারেন্টাইনে অবশ্যই রাখতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, আফ্রিকার নতুন ভ্যারিয়েন্টের ব্যাপারে আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। দেশে যেন কোনভাবেই এই ভ্যারিয়েন্ট প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য এখনই ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত। এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা হয়েছে। সীমান্ত ও বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়ানোর উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

 

ইত্তেফাক/ইউবি