গানটি দেশের প্রতি দায়বোধ থেকে করা : নকীব খান

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২১, ১৯:৪৪

এদেশের আধুনিক বাংলা গানের কিংবদন্তী সংগীত পরিচালক নকীব খান। কুমার বিশ্বজিত,তপন চৌধুরী, সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী থেকে শুরু করে একাধিক বরেণ্য শিল্পী রয়েছেন, যাদের প্রথম গান বা প্রথম অ্যালবাম তৈরি হয়েছে নকীব খানের সুরে। মন শুধু মন ছুঁয়েছে, ভাল লাগে জোছনা রাতে’সহ অগনিত কালজয়ী সুর যার গড়া। সম্প্রতি তিনি স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে অনবদ্য একটি গান নির্মান করেছেন।সাম্প্রতিক কাজ ও ইন্ডাষ্ট্রি প্রসঙ্গে কথা বললেন তিনি।

আপনি এর আগেও একাধিক দেশের গান করেছেন। সমবেত কন্ঠে তা প্রকাশ পেয়েছে। সেসব কাজের তুলনায় ৫০ টি ব্যান্ডের গানের জন্য সুর করার প্রেক্ষাপটটা কতটু আলাদা?


দেখুন তুলনা করে আসলে নিজের কাজ বলা মুশকিল। আর আমার কাছে গানটি প্রথমে কতজন গাইবে-তারচেয়ে বড় কথা, গানের কথা আর আবেগ কতটুকু। এই জায়গায় আমি জীবনেও ছাড় দিইনি। বামবার একটা মিটিংয়ে সবার সম্মতিক্রমেই গানটি সুর করার দায়িত্ব আমার উপরে পড়ে। সেই মিটিংয়ে আমি ছিলামও না। এরপর লিরিক আসে। গানের কথা লিখেছেন শাহান কবন্ধ। পরে সুরের সাথে লিরিকের সম্পাদনা করে গানটি দাঁড়িয়ে গেল। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশের ঐতিহ্য, স্বাধীনতা এসব-কিছুই ব্যান্ডের গানে বারবার এসেছে। আমরা একাধিক ব্যান্ড একাধিক গানে তরুনদের সে কথা জানিয়েছি। তাই ৫০টি ব্যান্ডের এই সমস্বরে গাওয়া এ গানটি দেশের প্রতি একটা দায়বোধ থেকে করা।

গানটিতে ৫০ জন শিল্পীর কন্ঠ বা সকল মিউজিশিয়ানের অংশগ্রহন তো কঠিন বা অসাধ্য। সেক্ষেত্রে বাছাই করাটা কতটা সংকটের ছিল?

খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা সংকটের ছিল। তবে আমরা তো একটা পরিবার। এখানে কেউই কারো থেকে খাটো নই। আমরা নিজেরাই অডিও রেকর্ডিং এ কিছু ব্যান্ড থেকে ভয়েস, কিছু ব্যান্ড থেকে গিটার, ড্রামস নিয়ে রেকর্ডিং সাজিয়ে নিয়েছি।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর থিমসংটি আপনার নির্মান। এইসব অনুভূতিগুলো কেমন?

ভীষণরকম ভাললাগার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা যে এত বড় দায়িত্বশীল কাজের জন্য তিনি আমার উপর আস্থা রেখেছেন। সত্যিই এটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম একটি কাজ।


দীর্ঘবিরতির পর কয়েক মাস আগে রেঁনেসা’র একটি সিঙ্গল রিলিজ করলেন। দেশের সবচেয়ে ম্যাচিউরড একটি ব্যান্ড, এত জনপ্রিয় একটি ব্যান্ড। নিজেদের ভেতরে সমঝোতা, দেখা সাক্ষাৎ, প্র্যাকটিসটা কেমন হয়?

দেখুন, আমরা সকলেই এতটা ব্যস্ত। এরপর সবচেয়ে সংকটে পড়েছি আমার ভাই পিলু এখন তার কাজের জন্য ঘানা থাকে। আগে ও ছিল মালয়শিয়াতে। তবুও কাছাকাছি ছিল। এরপরও আমাদের সর্বশেষ সিঙ্গলটিতে পিলু পুরোটা সময় দিয়েছে। গেল করোনার সময়। কিন্তু তারপরও ব্যান্ডে আমরা যারা আছি, নিয়মিত গ্রুপ কল ও যোগাযোগ হয়। আর প্র্যাকটিস, সপ্তাহের প্রতিদিন না হলেও আমরা মাঝে মাঝেই করি, নিজেদের আড্ডা দেবার সময়টুকুতে প্র্যাকটিস চলে। এটা তো আমাদের একধরনের বিশুদ্ধ অক্সিজেন নেবার মতো একটি কাজ । 

একজন কম্পোজারের যখন অনেককিছু প্রাপ্তি হয়ে যায়। এমন মহীরুহ অবস্থানে তরুন বা নবীশ একজন গায়ক -গায়িকা আপনাদের দরজা অব্দি আসতে ভয় পায়। বা দুরত্বে চলে যায়। সেটা কী আপনি বা আপনারা আঁচ করতে পারেন? এই দুরত্বটা কী মানতে ভাল লাগে আপনার?

দারুন এক প্রশ্ন করেছেন! দেখুন মোটেই ভাল লাগে না। আর আমি কিন্তু আজীবন ডেব্যু আর্টিস্টের কাজ করেছি। কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী থেকে শুরু করে একাধিক আর্টিস্টের প্রথম কাজ আমার করা। আমি তরুনদের কাজ করতে ভীষণ আগ্রহী। এখন যেই সমস্যাটা হয়, ওদের ধৈর্যটা। কারণ আমার একটা গানের কাজ করতে তো অনেক সময় লাগে। সেই সময়টা ওরা আমাকে দেবে কীনা? নয়ত আমি করতেই চাই। 

কম্পোজিশনের ক্ষেত্রে কোন ইন্সট্রুমেন্টটা আপনাকে ভীষণ টানে? 
 
অবশ্যই একুস্ট্যিক পিয়ানো। আমি নিজেও সুর করি আমার ঘরের এক্যুস্টিক পিয়ানোতে। যত যাই বলি, ইলেকট্রিক কীবোর্ডে-ঐ ফিলটা আসে না।
 
বাংলাদেশের এই ৫০ বছরে লাইভ সাউন্ডের কতটা উত্তরণ ঘটেছে বলে মনে করেন?

আমরা অনেকখানি এগিয়েছি। কিন্তু আমাদের তো সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং জানা অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিখে আসা কোনো ইঞ্জিনিয়ার নেই। আরেকটা বড় বাঁধা হলো- সাউন্ড ইক্যুয়েপমেন্ট। আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে এই জায়গায়। 

এ প্রজন্মের তরুনরা এখনও আপনাদের গান শুনছে। অথচ কয়েক দিনেই এখনকার গান হারিয়ে যাচ্ছে। নতুনদের ভেতরে কতটা সম্ভাবনা দেখেন?

ভীষণ সম্ভাবনা দেখি। আমি উদাহরণ দিয়ে বলতে পারব। পিলুর ছেলে নাদিম আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে কাজ বের হয়েছে। বিশ্ব প্লাটফর্মে কাজ করছে এখন বাংলাদেশী মিউজিশিয়ান। ওরাই বাংলা মিউজিকিকে অন্য লেবেলে নিয়ে যাবে। শংকা শুধু ওদের ধৈর্য নিয়ে। ওরা যেন লেগে থাকে। 
শেষ প্রশ্ন করি আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে। সে আপনার ছোটভাইয়ের মতো। দীর্ঘদিনের সারথি। ৫০ টি ব্যান্ডের কাজ করতে গিয়ে তাকে মিস করেননি?
খুবই মিস করেছি। শুধু এই কাজটিই নয়। যে কোনো কাজেই ওর শুন্যতা বোধ করি। যেমন এই প্রজেক্টে বাচ্চু বেঁচে থাকলে অবশ্যই গিটারের একটি সলো থাকতো বিশেষত ওর জন্য। এমন মিউজিশিয়ান তো আমরা আর পাবো না!

ইত্তেফাক/এএইচপি