মঙ্গলবার, ১৬ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চাইছি তোমার বন্ধুতা

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৪:৩৮

আমেরিকার ‘সুপারম্যান’ খ্যাত অভিনেতা ক্রিস্টোফার রিভ অ্যাবাভ ‘সাসপিশন’ ছবিতে এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করার আগে নিজেকে প্রস্তুত করতে এক প্রতিবন্ধী সংস্থায় নিয়মিত যেতেন।

রোজ মনে মনে বলতেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি ওদের মতো নই।’ কিন্তু কী আশ্চর্য! এই ছবির পরে এক দুর্ঘটনায় তিনি চিরতরে পঙ্গু হয়ে যান। বাকি জীবন তাঁকে হুইলচেয়ারেই কাটাতে হয়।

দুর্ঘটনায় সাময়িক বা স্থায়ী ভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়া-যে কোনো মানুষের ক্ষেত্রেই হতে পারে। গায়ত্রী চক্রবর্তীর একটি বই আছে ‘স্পিভাকের ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ বইটিতে একটি বাক্যে আছে-‘আমাদের সাবঅল্টার্নদের থেকে শেখা দরকার।’ সাবঅল্টার্ন কারা? যাদের ক্ষমতা নেই। যাদের কথা কেউ শোনে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে এক বিপুল সংখ্যক মানুষ এই শ্রেণিভুক্ত। প্রতিবন্ধীরাও তার আওতাভুক্ত। তাদের অসুবিধাগুলো শোনা খুব জরুরি। 

কিন্তু আমাদের দেশে গণপরিবহন কিংবা অফিস, কোথাও প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। একটি মানুষ যদি জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী হন বা দুর্ঘটনায় প্রতিবন্ধী হন, তাহলে সমাজের কাছে তিনি অপাঙ্ক্তেয়। আমাদের সমাজে স্থাপত্যনির্মাণ কাঠামোর পরিকল্পনা করা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ সুস্থ লোকেদের কথা ভেবে। নানা অসুখে পড়েও ক্রমশ পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যান অনেকে। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক হানাহানিতে, বোমা-গুলি-ধারালো অস্ত্রে প্রতিবন্ধী হয়ে যান বহু মানুষ। এই পঙ্গুত্ব নিয়ে কত অসুবিধেয় তাঁদের দিন কাটাতে হয় সেটা রাষ্ট্র বা তথাকথিত সুস্থ মানুষও ভাবেন না।

ইউনিসেফ বলছে-প্রতিবন্ধিত্ব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা। প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে প্রতিবন্ধিত্বের ওপর বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া যায়। খানার আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১০ অনুযায়ী, অক্ষমতার হার মোট জনগোষ্ঠীর ৯.১ শতাংশ, যদিও ২০১১ সালের জাতীয় আদম শুমারি অনুযায়ী এ হার শতকরা ১.৭ শতাংশ। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান উপলব্ধি হলো এই যে, প্রতিবন্ধী শিশু মূল যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয় সেটা তার বৈকল্য নয়, বরং সেটা হলো ব্যাপক বৈষম্য এবং কুসংস্কার।

প্রতিবন্ধী শিশুরা স্বাস্থ্যসেবা অথবা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সবচেয়ে কম সুযোগ পায়। বিশেষ করে তাদেরকে লুকিয়ে রাখলে কিংবা প্রতিষ্ঠানে দিলে অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সব গোষ্ঠীর মধ্যে তারা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন, অপব্যবহার, শোষণ এবং অবহেলার শিকার হয়। লিঙ্গও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়; কারণ ছেলের তুলনায় প্রতিবন্ধী মেয়েরা কম খাদ্য ও যত্ন পায়।

আমরা সারা বিশ্বেই দেখেছি প্রতিবন্ধিত্বের শিকার হওয়া অসংখ্য মানুষ সাফল্যের চূড়ায় উঠেছেন। শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েও একজন মানুষ সফল হতে পারে সেটা দেখিয়েছেন তাঁরা। বিশ্বের এমন ১০ জন বিখ্যাত মানুষ রয়েছেন যাঁদের কাছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা তারা অনায়াসেই জয় করেছেন। এঁদের মধ্যে শীর্ষভাগে রয়েছেন বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন তিনি। 

২১ বছর বয়সেই তিনি অ্যামিওট্রফিক ল্যাটেরাল স্কোরোসিস (এএলএস)-এ আক্রান্ত হন। ফলে তিনি কথা বলা ও চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এরপর আমরা বলতে পারি জন ন্যাসের কথা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সেরা গণিতবিদ। তিনি প্যারানয়েড স্রিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হন। এই রোগ মস্তিষ্কের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। চিন্তাশক্তি হারিয়ে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ন্যাস গণিত নিয়ে নতুন নতুন খোঁজ চালিয়ে যান। জ্যামিতি ও ক্যালকুলাসের জন্য বিখ্যাত তিনি।

বিখ্যাত এই আইরিশ লেখক ক্রিস্টি ব্রাউন সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত হওয়ার পরেও হাল ছাড়েননি। লিখে গিয়েছেন। দু’হাত অসাড় থাকার কারণে পায়ে টাইপ করে বইয়ের স্ক্রিপ্ট লিখতেন। তাঁর আত্মজীবনী ‘মাই লেফট ফুট’ বিশ্বে সাড়া জাগানো গ্রন্থ।

ডেমোস্থিনিস ছিলেন আথেন্সের বক্তা, যাঁর জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৪-তে। তাঁর কথা শোনার জন্য লোক ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাঁর বাণী ছিল অনুপ্রেরণার। এই মহান বক্তা কিন্তু তোতলা ছিলেন। সেই প্রতিবন্ধকতা পেরিয়েই তিনি নিজেকে বিশ্বখ্যাত করেছিলেন।

বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ মানসিক অবসাদের শিকার হয়েছিলেন। তারপরেও তাঁর হাত থেকে রত্ন চিত্র বেরিয়ে এসেছে একের পর এক।

নিজের ছবি আঁকাতে অন্যতম সেরা চিত্রকর ছিলেন ফ্রিডা কাহলো। মহান এ চিত্রশিল্পী পোলিও রোগে আক্রান্ত ছিলেন। আমেরিকার খ্যাতনামা লেখক ও সমাজসেবী হেলেন কেলার, জন্ম থেকেই তিনি দৃষ্টিহীন ও বধির। মার্কিন ট্র্যা অ্যান্ড ফিল্ড অ্যাথলেট ছিলেন মারলা রুনিয়ান। বিশ্ব বিখ্যাত এ দৌড়বিদ তিনবার ৫ হাজার মিটার চ্যাম্পিয়ন। অথচ ৯ বছর বয়সেই স্টার্গার্টস রোগে আক্রান্ত হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তারপরেও তিনি অলিম্পিকে অংশ নেন এবং তিনবার ৫ হাজার মিটার চ্যাম্পিয়ন হন। 

ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী সুধা চন্দ্রনের জন্ম কেরালাতে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। অস্ত্রোপচারের পর তাঁর পা কেটে ফেলা হয়। অসীম মনের জোর নিয়ে কৃত্রিম পা লাগিয়ে ফের মঞ্চে ফিরে আসেন স্বমহিমায়। জয় করেন গোটা বিশ্বকে।

এসব বিশ্বখ্যাত শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষই সত্যিকারের অনুপ্রেরণা। এরা শুধু সামান্য সহযোগিতা চায়, বন্ধুত্ব চায়। সেটা পেলে এরাও আকাশ ছুঁতে পারে। 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

হাসপাতালে হাঁসফাঁস 

রস 

পরম্পরা 

বঙ্গবন্ধু ও চলচ্চিত্রের একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

তামাশা 

কালো সূর্য

থাই মহাকাব্য রামাকীইন-কথা

পথের শেষ কোথায়? ঘৃণার শেষ কোথায়?