সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

অণুগল্প

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬:১৫

 

পাগল

ফজলুল হক পরাগ

অনুষ্ঠানে পাগলটা হুট করে ঢুকে পড়বে কেউ ভাবতেই পারেনি। রক্ত এবং পাগল দেখলে ফিরোজের অন্তরটা ছাৎ করে ওঠে। আজ ফিরোজের বৌভাত।

বাবার কথা খুব মনে পড়ছে তার। মনে পড়ছে পনেরো বছর আগের কথা। সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত কেটে কী রক্তই না ঝরছিল তার বাবার! ডাক্তারের পরামর্শে থ্যাতলানো হাতের কব্জি পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়। দীর্ঘ চিকিৎসায় জহির সাহেব সুস্থ হন ঠিকই কিন্তু চাকরি হারান। তারপর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যান।

প্যান্ডেলের এক কোনায় খালি টেবিলে পাগলটাকে খাবার দেওয়া হয়।

বাম হাতে গ্রোগাসে খাচ্ছেন তিনি। ডান হাতের কব্জি পর্যন্ত কাটা! এতক্ষণ খেয়াল করেনি ফিরোজ। 
পাগলটাকে জাপটে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে ফিরোজের... 

[ময়মনসিংহ]

 

অংশীদারিত্ব
কারিশমা ওয়াজেদ শ্রেয়সী

আমার বড় আপা আর নিয়াজ ভাইয়ার ছিল প্রেমের বিয়ে।
ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার থেকেই দুজনের প্রণয়।
এরপর পরিণয়। সোনার সংসার ছিল তাদের। কিন্তু হঠাৎ যেন ঘোর অমাবস্যায় ছেয়ে গেল সবকিছু!
তারপর হঠাৎ একদিন নিয়াজ ভাইয়া অন্য এক মেয়েকে বিয়ে করে আনে।

বিয়ের ঠিক দুদিন পরেই নতুন বউয়ের ঘর থেকে দুলাভাইয়ের গলা কাটা ও বীভৎস লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নতুন ঐ বউকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। মেয়েটা চিৎকার করে যদিও বলছিল, ‘আমি নির্দোষ, আমি নিরপরাধ, আমি খুন করিনি।’

পুলিশ, আইন, আদালত তথ্য ও প্রমাণের উপর বিশ্বাস করে। কারো কথার উপর না।
কিন্তু সেদিন আমি আপাকে বিড়বিড় করে বলতে শুনেছিলাম ‘তোমাকে ক্ষমা করতে চেয়েছিলাম নিয়াজ।’ 

[ঢাকা]


বুড়ো পৃথিবী
বিনিয়ামীন পিয়াস 

-বাজান, পিরথিবি বুড়া হয় না? 
নৌকার পাটাতনে বসে জিজ্ঞেস করল সাত বছরের ছেলেটি।

-হয়তো রে বাজান। সবাই বুড়া হয়। তয় সবাইর বুড়া হওনডা একরকম না।
দাঁড় বাইতে বাইতে মাঝবয়েসি হাশেম মাঝি উত্তর দেন। শান্ত নদীতে বয়ে চলা নৌকাটিতে শুধু তিনি আর তার ছেলে বসে আছেন। 

-তাইলে কেমুন বাজান?
-মানুষ বুড়া হইলে যেমুন চামড়ায় ভাঁজ পইড়া যায়, চোউখের জতি কইম্মা যায়, তেমুন পিরথিবি বুড়া হইলে হ্যারও আমাগোরে দুই হাত ভইরা দেওনের ক্ষমতা কইমা যায়। তয় এইডা বাইরে থেইকা দেহন যায় না। মাইনষের বড় অসুখ হইলে যেমুন ভিতরডা পইচা যায়, কিন্তুক বাইরে দিয়া বুঝোন যায় না তেমুন আর কি। 

এটুকু বলে হাশেম মাঝি কেমন উদাস হয়ে যান। তাঁর ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। কোথায় হারিয়ে গেল সেই সোনালি ধানের গোলা আর লাল বাছুরের গোয়াল? কোথায় হারিয়ে গেল সেই নবান্নের আয়োজন, হাড় কাঁপানো শীতে খেজুরের রসের ‘শিন্নি’ বা ধোঁয়াওঠা গরম ভাপা পিঠা কিংবা আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে দলবেঁধে মাছধরা উৎসব? নদীমাতৃক দেশটির হাজারো মানুষের দীর্ঘদিনের যাপিত সেই উৎসবগুলো যেন গভীর কোনো ক্ষোভে ঠাঁই নিয়েছে রূপকথার গল্পে। 

-বাজান, পিরথিবি কি তাইলে বুড়া হইয়া গেছে?

ছেলের কথায় ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফেরেন তিনি। আসলেই তো, পৃথিবী কি বুড়ো হয়ে গিয়েছে? তার সোনালি যৌবন কি তবে শেষ? তিনি করুণ চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই প্রশ্নের উত্তর যে তাঁর জানা নেই। 
নৌকা চলতে থাকে। নদীর স্রোত বয়ে যেতে থাকে, আর সেইসঙ্গে একটু একটু করে বুড়ো হতে থাকে পৃথিবী!


এক ব্যাগ রক্ত
মোহাম্মদ নূরুল্লাহ

সুজানা! শোন, আজ তোমাকে একটি গল্প শোনাব। 
সুজানা আগ্রহ নিয়ে দাদুর আরো কাছে গিয়ে বসল। দাদু বলতে থাকল-এক যুগ আগের কথা! এক ভদ্রলোকের অনেকদিন সন্তানাদি হচ্ছিল না। অবশেষে সুসংবাদ একদিন এলো। মেয়েটির বাবার আর শ্বশুর বাড়ির সবার নয়নে আনন্দাশ্রু। সন্তান পৃথিবীতে আসার সময় আসন্ন। কিন্তু একি জ্বালা! ডাক্তার বললেন, রক্ত লাগবে।  

পোয়তির স্বামী রক্তের জন্য অস্থির হয়ে উঠল। তখন তার এক কলিগ জানতে চাইল রক্তের গ্রুপের নাম। সেই গ্রুপের সঙ্গে ভদ্রলোকের রক্তের গ্রুপ মিলে গেল। ভদ্রলোক সহাস্যে বলে ফেললেন, আচ্ছা আমি রক্ত দিব।
দাদু বলতে থাকলেন-জানো সুজানা! ইংরেজরা কেন স্বার্থপরতাকে সেলফফিস বলে থাকে?

সুজানা বলল, দাদু! আমার মনে হয়, মাছ বিক্রেতা মাছটির গুণাগুণ বিচার না করে মাছটি বিক্রি করতে পারলেই বাঁচে। মাছটি কি ভালো আছে? না পচা, সেদিকে নজর না দিয়ে কোনোমতে ক্রেতার হাতে ধরিয়ে দিতে পারলেই সে বাঁচে; এরকম মনে হয়।
দাদু বলল, সুজানা তুমি ঠিকই বলেছ। 

শোন তাহলে-যিনি রক্ত দিয়েছেন তিনি একজন শিক্ষক। যাকে রক্ত দিবেন তিনি তাঁর ছাত্রী। তাহলে রক্ত দিতে তো কোনো ঝামেলা নেই। ঝামেলা এক জায়গায় রয়েছে। দুজন ছিলেন দুই ধর্মানুসারী। আগেই বলেছি পুয়াতির স্বামী ভদ্রলোকের কলিগ। রক্তদাদা এই কলিগকে পুয়াতির স্বামী প্রায়ই খোঁচা মেরে কথা বলতেন। কিন্তু রক্তদাতা ভদ্রলোক রক্ত দিতে কখনো এসব বিবেচনায় আনেননি। তিনি রক্ত দিয়ে কলেজে চলে গেলেন, পাছে তাঁর ক্লাস নেওয়ার সময় পেরিয়ে যায়। ক্লাসেও যথাসময়ে প্রবেশ করলেন। 

কিন্তু ক্লাসটি তিনি ঠিকমতো মনোযোগ দিয়ে করতে পারলেন না। তাঁর মাথা ঘোরাতে থাকে, চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। এদিকে অন্যধর্মের লোক বলে, পোয়াতির স্বামী রক্তদাতাকে ভালোভাবে নেননি। কোনো কৃতজ্ঞতাবোধও প্রকাশ করেননি। কিন্তু তারপরও রক্তদাতা খুশি, ভীষণ খুশি। তিনি একজনের জীবন বাঁচানোর জন্য রক্ত দিয়েছেন-ব্যাস এটাই সত্য। সবার আগে তো মানুষ সত্য। 

[ফরিদপুর] 

 

আকাশের তারা
শেখ ফয়জুর রহমান

ক্লাসে বাংলা ম্যাডাম ঢুকেই ছাত্রছাত্রীদের ‘মা’ রচনাটি লিখতে বললেন।
সবাই চুপচাপ খাতায় যে যার মতো লিখছে ।

হঠাৎ মেয়েদের পাশ থেকে কান্নার আওয়াজ শুনে ম্যাডাম চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
লাস্ট বেঞ্চ থেকে কান্নার আওয়াজ আসছে দেখে সেদিকেই এগোলেন।

দেখলেন, নুসাইবা নামের এক মেয়ে কাঁদছে। ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন-কী হয়েছে নুসাইবা? কাঁদছ কেন? 
নুসাইবা কোনো কথা বলতে পারছে না।

তার পাশে বসা সহপাঠিনী বলল, ওর মা নেই ম্যাম। ওর মা আকাশের তারা হয়ে গেছে। 
ম্যাডাম বললেন, ঠিক আছে, আজ তোমরা ‘আকাশের তারা’ নিয়ে রচনা লেখো।
[শেরপুর]
 
মাত্র দশ টাকা
মো. মুরশিদুল ইসলাম সৌরভ

হাতে সময় কম। দ্রুতই পৌঁছতে হবে। এজন্য একটু জোরে হেঁটে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা। ভিক্ষুককে টাকা দিতে গিয়ে হাত যায় পেছনের পকেটে, কিন্তু ছোট ব্যাগটি নেই। হয়তো, তাড়াহুড়ো করলে এমনই হওয়া উচিত। বিকাশে আছে এক টাকা সাঁইত্রিশ পয়সা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালক মামার কাছ থেকে প্রথমে ওনার মোবাইল নম্বর তারপর দশ টাকা নিলাম। বললাম যে, চিন্তার কারণ নেই মেসেজ যাবে আপনার ফোনে। বাসে উঠে দেখি সিট ফাঁকা নেই। ভাড়া দিলাম সেই দশ টাকা। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর দেখি সাত মিনিট দেরি হয়ে গেছে। তারপর দুই ঘণ্টা তিপ্পান্ন মিনিট অনবরত লিখলাম...

[জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]
 

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

রাজনীতির মহাকবির বয়ান

‘তুমি তো লয়ের পুতুল!’ 

অস্তাচলে বাংলা থ্রিলারের নবাবি সূর্য 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অভিনয় 

কবিতা

মঈন ও তার বাইসাইকেল