বৃহস্পতিবার, ২০ জানুয়ারি ২০২২, ৫ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে দুর্ভোগে দেশের নারীরা

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৫১

রাজধানীর একটি বস্তির কিছু ঝুপড়ি ঘরের একটিতে থাকেন মরিয়ম বেগম। বছর দুইয়েক আগে খুলনার কচুয়া থেকে তিনি রাজধানীতে এসেছেন। আগে তার স্বামী শহরে কাজ করতেন। আর গ্রামে মরিয়ম বেগম তার দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। স্বামী অসুস্থ হয়ে বছরখানেক আগে মারা গেলে তিনি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ছেলেকে নিয়ে শহরে আসেন কাজের সন্ধানে। গ্রামে কাজ নেই। খাওয়া নেই। তাই তাদের শহরে আসা বলে জানান মরিয়ম।

একই অবস্থা বরিশালের বরগুনা থেকে আসা ইউনুস মিয়ার। তিনিও  বছরখানেক আগে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে বস্তিতে উঠেছেন। নদীভাঙনে তিনি বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়েছেন। সেখানে তিনি ছোট একটা মুদির দোকান করতেন। ঝড়ে তার দোকান, বাড়ি-ঘর সব উড়ে গেছে। জমানো টাকা খেতে খেতে নিঃস্ব হয়ে তিনি ঢাকায় এসেছেন। এখন ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করেন। আর তার স্ত্রী বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। দুজনার আয়ে কোনো রকমে তাদের ছোট ছোট তিন সন্তান নিয়ে সংসার চলে। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের সামনে কথা হয়, পাসপোর্ট করতে আসা নাজমা আক্তারের সঙ্গে। তিনিও বরিশালের ভোলা থেকে এসেছেন। নাজমার দুই মেয়ে, স্বামী তাকে ছেড়ে অন্যত্র বিয়ে করেছেন।

নাজমা জানান, বাপের বাড়িতে ছিলাম, নদীভাঙনে বাড়িঘর সব গেছে। গ্রামে কিছুই নাই। জীবন বাঁচাতে ঢাকা শহর এসেছেন তিনি। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়ের বয়স ১৩ বছর। নাজমা তার মায়ের কাছে মেয়েকে রেখে তিনি এখন যাবেন বিদেশে কাজ করতে। শুধু মরিয়ম, নাজমা আর ইউনুসই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এমন অনেকে বিভিন্ন জেলা থেকে বাস্তুহারা হয়ে রাজধানীর বস্তিগুলোতে ঠাঁই নিয়েছেন। তবে তারা রাজধানীতে কাজ করে টাকা জমিয়ে আবারও গ্রামে ফেরার স্বপ্ন দেখেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ইন্টারনাল ডিসপ্লেসমেন্ট মনিটরিং সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গত ৬ বছরে দেশের ৫৭ লাখ মানুষ গৃহহারা হয়েছেন। ঢাকার বস্তি এলাকায় বাসকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে স্থানান্তরিত হয়েছেন বলে জানা যায় আইএমও এর তথ্যে। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের সম্মুখীন হন বাংলাদেশের নারীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের ৮০ শতাংশই নারী। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯ জেলার ১৪৭ উপজেলায় ২০১১ সালের আদমশুমারির ৩ কোটি ৪৮ লাখ মানুষের মধ্যে ৪৯ শতাংশ নারী। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফামের প্রকল্প পরিচালক এম বি আকতার মনে করেন, একদিনেই এই ৩ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হবে না। ইতিমধ্যেই বাস্তুহারা হয়ে অনেক মানুষ নগরে আশ্রয় নেওয়া শুরু করেছে। এখনই পুনর্বাসনের বিষয়ে পরিকল্পনা প্রয়োজন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী আবদুস সোবহান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আজ গ্রামীণ জনগোষ্ঠী যেভাবে স্থানচ্যুত হয়ে নগরে আসছে এবং এর ফলে নগরে যেভাবে নানাবিধ সংকট তৈরি হচ্ছে অবশ্যই এক সঠিক পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে এই চাপ, নতুন সংকট ও সমস্যা উত্তরণে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।’

ভূগোলবিদ ও নগরগবেষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘নগরদরিদ্র জনগোষ্ঠীর সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং সকল ধরনের সরকারি সেবা-সহযোগিতায় তার অভিগম্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে নগরদরিদ্রদের আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কুটির শিল্পভিত্তিক নিরাপদ কর্মসংস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণসহ উপযোগী অভিযোজন উদ্যোগগুলোকে সহায়তা করা জরুরি। আর এই কাজে স্থানীয় সরকার, প্রশাসন, গণমাধ্যম, সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, বস্তিবাসীদের নিয়ে কর্মরত সংগঠন—সকলের ঐক্য জরুরি।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

জাতিসংঘের নারী নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি হলেন রাবাব ফাতিমা

‘নারী-পুরুষে সমতার জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা’

দক্ষতার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে প্রতিবন্ধী নারী

নির্যাতন ও সহিংসতা নারীর অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে: ইন্দিরা