বাংলা ভাষার এনসাইক্লোপিডিয়া

মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:৩৭

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাংলাভাষীদের আত্মপরিচয়, চেতনা ও রাষ্ট্রভাবনার উদ্গম ও বিকাশের ধারণা নবায়িত করার চেতনা থেকেই অ্যাডর্ন পাবলিকেশন প্রকাশ করেছে ‘মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ’

সভ্যতার পূর্বশর্ত হলো ভাষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ ভাষার ব্যবহার শিখেছে আজ থেকে অন্তত ষাট হাজার বছর আগে। মানুষ যখন থেকে ভাষার ব্যবহার শিখেছে তখন থেকেই মানবসভ্যতার শুরু। এ সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে বহু ভাষার উদ্ভব হয়েছে, এর মধ্যে অনেক ভাষা বিলীন হয়েও গেছে। ভারত উপমহাদেশে আর্যদের আগমনের পর আর্য ভাষার দাপটে দক্ষিণ ভারত ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলের ভাষাগুলো বিলুপ্ত হয়ে যায়। বাংলা একটি আর্য ভাষা, যার বয়স অন্তত হাজার বছর। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩০ কোটির মতো লোক এ ভাষায় কথা বলে।

ইউনেস্কোর এক জরিপে বলা হয়েছে, একুশ শতকের শেষ অবধি বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত ভাষাগুলোর শতকরা চল্লিশ ভাগ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পৃথিবীতে কেবল ইংরেজি, চীনা ও স্প্যানিশ ভাষার মতো সংখ্যাধিক্য মানুষের ভাষা টিকে থাকবে। একুশ শতকে বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি, আকাশ-সংস্কৃতি এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহের ফলে তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ ভাষা এখন হুমকির মুখে। তৃতীয় বিশ্বের সেসব ভাষাই টিকে থাকবে যেসব ভাষার ব্যবহারকারীরা তাদের মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, রক্ষণশীল এবং যত্নশীল। নিজেদের ভাষার প্রতি যেসব জাতির শ্রদ্ধা নেই উপরন্তু হীনম্মন্যতা এবং অকারণে বিদেশি ভাষা ব্যবহার ও মিশ্রণের প্রবণতা রয়েছে, তাদের ভাষা টিকে থাকা দুষ্কর। এসব ভাষা একুশ শতকের মধ্যেই উপভাষায় পরিণত হয়ে পরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ইউনেস্কোর এই বক্তব্যের পরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, বাংলা ভাষা কি টিকে থাকাদের কাতারে থাকবে নাকি বিলুপ্তির কাতারে স্থান পাবে? এর উত্তর পাওয়ার জন্য ইউনেস্কোর টিকে থাকার শর্তগুলো বাংলা ভাষার রয়েছে কি না সেদিকে তাকাতে হয়।

বাংলা ভাষার রয়েছে হাজার বছরের সাহিত্য ও ঐতিহ্য, সুদীর্ঘকালের পরাধীনতাও যা ধ্বংস করতে পারেনি। একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে বাংলাদেশের সব রাস্তাঘাট, দোকানপাট এবং স্থাপনার নাম বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু আমাদের হীনম্মন্যতা ও উদাসীনতার কারণে বর্তমানে তা আবার ইংরেজি ভাষায় পরিবর্তিত হয়েছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক না যেতেই আমাদের মাতৃভাষার প্রতি অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা, উপেক্ষা এবং নৈরাজ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, বাংলা ভাষার লালিত্য, মাধুর্য ও সৌন্দর্য প্রায় বিলুপ্ত হতে বসেছে।

ওপরের কাহিনিপ্রবাহ থেকে আসলে বাংলা ভাষা টিকে থাকবে কি না তার কোনো উপসংহারে আসা যায় না। টিকে থাকার শর্তে ইউনেস্কো যা বলেছে অর্থাত্ মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, রক্ষণশীল এবং যত্নশীল থাকা তা আমাদের মধ্যে আছে। কারণ এগুলো না থাকলে কোনো জাতি ভাষার জন্য রক্ত দিতে পারে না। আবার বাংলা ভাষার যেমন-ইচ্ছা-তেমন-ব্যবহার অর্থাত্ ভুল ব্যাকরণে ভুল বানানে বাংলা ব্যবহার, বাংলার সঙ্গে ইংরেজি শব্দ মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি ভাষা তৈরি, রোমান হরফে বাংলা লেখা—এগুলো ভাষার প্রতি উদাসীনতারই ফল। এ দিক দিয়ে দেখলে বলা যায়, ইউনেস্কোর বক্তব্য অনুযায়ী বাংলা ভাষাও বিলুপ্তির তালিকায়ই ঠাঁই পাবে। বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হোক তা কোনো বাংলাভাষীই চাইবে না। তাই আমাদের নজর দিতে হবে কীভাবে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে পারি সেদিকে। আর সে চেষ্টা করতে হলে আগে খুঁজে বের করতে হবে ভাষার প্রতি আমাদের এই ঔদাসীন্য ও অবজ্ঞার কারণ। আসলে বাংলা ভাষার প্রতি এই উদাসীনতা ও অবজ্ঞা মূলত বাংলা ভাষার গুরুত্ব, আভিজাত্য, বাংলা ভাষার জন্য অতীত সংগ্রাম-রক্তদানের মতো গর্বিত ইতিহাস না জানারই ফল।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাংলাভাষীদের আত্মপরিচয়, চেতনা ও রাষ্ট্রভাবনার উদ্গম ও বিকাশের ধারণা নবায়িত করার চেতনা থেকেই অ্যাডর্ন পাবলিকেশন প্রকাশ করেছে ‘মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ’। ভাষা আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০২ সালে এই গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেন অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসাইন। সেই থেকে একদল ভাষাপ্রেমীর দীর্ঘ এবং নিরলস প্রচেষ্টায় ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয় ‘মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ’। বাংলা ভাষার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বকে উপজীব্য করে বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, চিন্তানায়ক ও গবেষকদের গত চারশ’ বছরের মনের ভাব ও ঋদ্ধ চিন্তাভাবনা এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। এতে আছে বাংলা ভাষাপ্রীতি, বাংলা ভাষার ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, বিবর্তন, বাংলা ভাষা ও ভাষাবিতর্ক নিয়ে ভাষা আন্দোলনের আগে ও পরে আমাদের বরেণ্য জ্ঞানীজনদের লেখা; ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রবন্ধ, কবিতা, ছড়া ও গান; ভাষাবিতর্ক নিয়ে বিভাগপূর্ব পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয় এবং ভাষাসৈনিকদের স্মৃতিচারণ ও সাক্ষাত্কার। বাংলা ভাষার নানা ঐতিহাসিক কালপর্বে দুই বাংলা থেকে নির্বাচিত লেখকদের সৃষ্টিশীল ও গবেষণামূলক রচনাসম্ভারে সমৃদ্ধ এই গ্রন্থটি একটি অনন্য প্রকাশনা। ১৭০০-এর বেশি পৃষ্ঠাব্যাপী এ গ্রন্থের বিষয় পরিধি যেমন সুবিস্তৃত, তেমনি এর লেখক পরিধিও বিশাল। প্রাচীন ও মধ্যযুগের শাহ মুহম্মদ সগীর, ভারতচন্দ্র রায়, সৈয়দ সুলতান, আবদুল হাকিম থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ হয়ে এ প্রজন্মের গবেষক প্রতিনিধি পর্যন্ত এতে স্থান পেয়েছে। তিন শতাধিক লেখকের বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলন বিষয়ক লেখার সমাবেশ ঘটানো হয়েছে এই গ্রন্থে। মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ তাই ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নয়, বরং এখানে ইতিহাসের উপাদানগুলোকে অনেক মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে অখণ্ড আকারে গ্রন্থিত করা হয়েছে। এই গ্রন্থ আজ ও আগামীর বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের যেমন নিজ ভাষাকে ভালোবাসতে শেখাবে, তেমনি বাংলা ভাষা, বাংলা ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ এবং ভাষা আন্দোলন সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্যপিপাসার অনেকটুকুই পূরণ করতে পারবে। মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ যেমন একুশের, তেমনি বাংলা ভাষারও স্মারক। বাংলাদেশের একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এমন একটি গ্রন্থ প্রকাশ কিছুটা অবিশ্বাস্যই বলা চলে। কিন্তু এই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে অ্যাডর্ন। বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে বইটি স্থান পেলে শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও আগ্রহীরা উপকৃত হবেন বলে মনে করি।

এই সুবিশাল গ্রন্থে রয়েছে ২৮টি পর্ব। পর্বগুলো হলো : বাংলা ভাষা আমার অহংকার, আ-মরি বাংলা ভাষা, বিবর্তন, মুদ্রণশিল্প, ভাষা বিতর্ক, ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, পথিকৃত্, বায়ান্নর একুশে, সংবাদপত্রে ভাষা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, ভাষাসৈনিক, ভাষা আন্দোলনে নারী, ভাষা শহীদ, জেলায় জেলায় ভাষা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন :দেশে দেশে, বিদেশে বাংলা চর্চা, শহীদ মিনার, ভাষা আন্দোলনে রাজনীতি-সংস্কৃতি-অর্থনীতি, ঐশ্বর্য, উত্সৃজন, একুশের সংকলন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভাষা সংস্কার, বাংলা চর্চা ও ব্যবহার, সর্বস্তরে বাংলা : সমস্যা, সাক্ষাত্কার, ভাষা আন্দোলনের দলিল, বাংলা ভাষার ভবিষ্যত্। এই সুবৃহত্ গ্রন্থটির বিস্তৃত সম্পাদকীয়, সহায়কগ্রন্থ ও তথ্যপঞ্জি, লেখক-নির্ঘণ্ট ও লেখক-পরিচিতি এটিকে বাংলা ভাষার এনসাইক্লোপিডিয়া-সদৃশ আকরগ্রন্থে পরিণত করেছে।

‘মহান একুশে সুবর্ণজয়ন্তী গ্রন্থ’ প্রকাশ করেছে অ্যাডর্ন পাবলিকেশন। প্রকাশক, পরিকল্পক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সৈয়দ জাকির হোসাইন। উপদেষ্টা সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দের নেতৃত্বে একদল গবেষক-কর্মী বইটির তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, সংকলন ও সম্পাদনা করেন।