শাহেদ রহমান
পদ্মার দক্ষিণ পাড়ে কোনো এক গ্রামে সালেহার ছায়াঘন গোলপাতা ঘর,
শামীম তাহার ছেলে, তরতাজা যুবা, ঢাকার পলাশী ব্যারাকের কাছে থাকে এক মেসে,
এ-বাড়ি, সে-বাড়ি, ছোটখাটো কাজের শ্রমিক, সেই ১৯৪৭ সাল, ডিসেম্বর মাস শেষ হবে-হবে।
সালেহা পাঠায় তাকে ডাকযোগে পোস্টকার্ড চিঠি—
‘বাবা, বাড়ির পালানে কুমড়া ও লাউয়ের চাষ করেছি এবার,
তরতাজা লাউ-পাতা সবুজে-সবুজে বড় শোভা,
পাশে কুমড়ার গাছ-লতা, ফুলে-ফুলে বাসন্তীরঙ, মন ভরে যায় দেখে, তুমি কবে ফিরবে বাড়িতে?’
আবার সালেহা লেখে, ‘তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরো,
ভাজা কুমড়াফুল, আমন চালের গরম ভাত, কাঁসার থালায় দেবো তোমাকে, মন ভরে দেখব—কী তৃপ্তিতে তুমি খাও...!’
সালেহা পায় না চিঠির উত্তর, সন্তান ফিরবে ঘরে—এই আশা পাখির মতন
মনের বাতাসে তার গুনগুন করে, শামীমকে দেখবার স্বপ্ন তার অন্তরে-আত্মায় নিত্য ভাসে
যেমন ফুলের গন্ধ হাওয়ায়-হাওয়ায়।
একদিন সালেহার কানে পৌঁছল খবর, শুনলও নানান গুজব—
বাংলা আর উর্দু ভাষা সমর্থকদের মধ্যে অবার্য সংঘর্ষে, আহত অনেকজন,
মরে গেছে কেউ-কেউ।
না পেয়ে ছেলের চিঠি, এমন খবরে, আশা-নিরাশার দোলাচলে, ঢেউয়ে-ঢেউয়ে,
জননীর মন ভেঙে-চুরে গেল, প্রায় উন্মাদিনী, দু চোখে শ্রাবণধারা,—বাড়ির উঠোন ছেড়ে,
গ্রামের পাশের খাল-নদী ছেড়ে, মিশে গেল বঙ্গোপসাগরে,
চিন্তা-দুশ্চিন্তার জাঁতাকলে পড়ে একদিন সালেহা নির্বাক হয়ে গেল কবরের মতো।
তিন-চার মাস পর হঠাত্ শামীম ফিরল বাড়িতে, সন্তানকে দেখে দিশেহারা,
মুখের ঘোমটা ফেলে, উড়িয়ে মাথার বর্ণহীন চুল, দু হাত বাড়িয়ে দেয় ছেলেকে ধরবে বলে বুকে,
ঝড়ে-পড়া পাখিকে যেমন বৃক্ষ রক্ষা করে নিরাপদ নীড়ে তার ডালে-ডালে।
সন্ধ্যায় যেমন ঝাউবনে জোনাকিরা ডেকে আনে আলোর মুখর মেলা,
শামীমকে দেখবার পর, সালেহার দু চোখে তেমনি জাগল আনন্দের জ্যোত্স্নাপ্রভা,
ফুটল না একটিও কথা তার মুখে আর কোনোদিন।
