সোমবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১০ মাঘ ১৪২৮
দৈনিক ইত্তেফাক

যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে আনলো রাশিয়া

ন্যাটোতে যোগ দিলেই ইউক্রেনে হামলা!

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ২১:৪০

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একজন স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু গত এপ্রিলে তিনি ইউক্রেন ইস্যু যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বকে যেভাবে শাসিয়েছিলেন তা বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমে বিরল বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।

রুডওয়ার্ড কিপলিংয়ের বিখ্যাত বই দ্য জঙ্গল বুকের কাহিনি উদ্ধৃত করে পুতিন বলেছিলেন, ‘শের খান নামের বাঘকে যেমন তুষ্ট করত কিছু শেয়াল, তেমনিভাবে কিছু পশ্চিমা দেশ আমেরিকাকে তুষ্ট করতে ব্যস্ত। আমরা অশান্তি চাই না। সেতু পোড়াতে চাই না। কিন্তু আমাদের ভদ্রতাকে কেউ যদি দুর্বলতা মনে করে, ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করে, তখন আমাদের জবাব হবে দ্রুত এবং তীব্র। আমরা তখন সীমা-পরিসীমা বা অনুপাতের ধার ধারব না। এখন ডিসেম্বর মাস। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাশিয়ার উত্তেজনা চরম আকারে বেড়েছে। এর মূল কারণ ইউক্রেন, সঙ্গে আছে বেলারুশও। শুক্রবার বাইডেন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইউক্রেনে হামলা প্রতিহত করবে আমেরিকা। আবার রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমকি দিয়েছেন, রাশিয়া তার ঘরের পাশে ন্যাটোর নতুন কোনো তত্পরতা কোনোভাবেই সহ্য করবে না। ইউক্রেন সীমান্েত রাশিয়ার সৈন্য সমাবেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপে যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন দেখাও শুরু করেছেন অনেকে।

ট্যাংকস ফর টকস : অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন ইউক্রেন সীমান্তে ট্যাংক আর সৈন্য পাঠিয়ে মস্কো আমেরিকাকে আরেকবার আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে চাইছে। পুতিন ও বাইডেনের মধ্যে আরেকটি শীর্ষ বৈঠক চাইছে রাশিয়া। গত জুনে বাইডেন ও পুতিনের মধ্যে বৈঠক হলেও কেউই কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। কিন্তু ইউক্রেনে সামরিক সাহাঘ্যের ইসু্যতে খুব অল্প হলেও একটি বোঝাপড়া হয়তো সেখানে হয়েছিল বলে মনে করেন মস্কোতে গবেষণা সংস্হা আইআইএসির গবেষক অন্দ্রেই কতু‌র্নভ। তবে সেক্ষেত্রে রাশিয়া সফল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ আগামী সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মধ্যে ভিডিও সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। ওয়াশিংটন ও মস্কো দুই পক্ষ থেকেই বিষয়টি শুক্রবার নিশ্চিত করা হয়েছে।

পুতিন হয়তো এখনো বিশ্বাস করেন যে তিনি বাইডেনের সঙ্গে একটি বোঝাপড়া করতে পারবেন। কিন্তু তিনি যদি দেখেন তার কোনো আশাই নেই তাহলেই সম্ভাব্য বিপদ। পুতিন তখন এমন পথ তিনি নিতে পারেন যা ধারণা করা কঠিন বলে উল্লেখ করেছেন মস্কোতে রুশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক তাতিয়ানা স্তানোভায়া। ইউক্রেন নিয়ে মস্কোতে গত সপ্তাহে রুশ কূটনীতিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে পুতিন বলেন, আমাদের হুঁশিয়ারিতে তারা যে কান দিচ্ছে তার লক্ষণ পরিষ্কার। কারণ তারা উত্তেজিত। পশ্চিমা দেশগুলো যেন রাশিয়ার কথা কানে দেয় তার জন্য উত্তেজনা অব্যাহত রাখতে হবে।

ন্যাটোতে যোগ দিলে ইউক্রেনে হামলা! : ইউক্রেনের সরকার এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের সতর্ক করতেই যে সীমান্তে সেনা সমাবেশ তা নিয়ে রাশিয়া রাখঢাক করছে না। অন্দ্রেই কতু‌র্নভ বলেন, ইউক্রেনের সীমান্েত সৈন্য সমাবেশের অর্থ এই নয় যে, রাশিয়া সৈন্য ঢুকিয়ে দেবে। সম্প্রতি মস্কো থেকে বহিষ্কৃত বিবিসির সংবাদদাতা সারা রেইন্সফোর্ড বলছেন, সিংহভাগ বিশ্লেষক এখনো মনে করছেন না যে, রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান চালাবে। ক্রেমলিন স্পষ্ট একটি বার্তা দিতে চাইছে যে, ইউক্রেনকে যেন কখনই ন্যাটো জোটের সদস্য না করা হয় এবং তাদের এই ‘রেড লাইন’ ভাঙলে রাশিয়া তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত ন্যাটোর পক্ষ থেকে যেভাবে ইউক্রেনকে অস্ত্র এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তাতে পুতিন প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। পুতিন ভাবছেন এখনই কিছু না করলে ইউক্রেনে ন্যাটো ঘাঁটি হবে। সুতরাং এখনই তাকে তা আটকাতে হবে।

ইউক্রেন যে ন্যাটো জোটে যোগ দিতে উদ্গ্রীব তা অজানা কিছু নয়। আর তার দোরগোড়ায় আরেকটি ন্যাটো দেশের উপস্হিতি যে রাশিয়া মানবে না, তাও নতুন কিছু নয়। কিন্তু রাশিয়া দেখছে যে তাদের আপত্তির তোয়াক্কা না করে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো থেকে ইউক্রেনে অস্ত্র যাচ্ছে।

পূর্ব ইউক্রেনে রুশ সমর্থিত বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য তুরস্কে তৈরি ড্রোন কিনেছে ইউক্রেন। ক্রিমিয়ার কাছে আকাশে সম্প্রতি পারমাণবিক বোমা ফেলতে সক্ষম দুটো আমেরিকান যুদ্ধ বিমান উড়তে দেখার ঘটনায় মস্কো প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। নানাভাবে ইউক্রেনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করছে রাশিয়া। গত সপ্তাহে রুশ গুপ্তচর সংস্হা, এসভিআর, ইউক্রেন সম্পর্কিত এক বিবৃতিতে ২০০৮ সালে জর্জিয়ার যুদ্ধের অবতারণা করেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া জাতিগত রুশ অধু্যষিত দক্ষিণ ওসেটিয়া কবজা করতে গিয়ে তত্কালীন জর্জিয়ান প্রেসিডেন্ট সাকাশভিলিকে কতটা মূল্য দিতে হয়েছিল বলে এসভিআর এর বিবৃতিতে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। জর্জিয়া ওসেটিয়া দখল করতে গেলে রাশিয়া সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। 

তাতিয়ানা স্তানোভায়া বলেন, জর্জিয়ার ফর্মুলা ক্রেমলিনের টেবিলে। ইউক্রেনের বেলাতেও তার প্রয়োগ হতেই পারে। তবে তার অর্থ এই নয় যে, রাশিয়া তার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। একটি বিকল্প রয়েছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মার্ক গ্যালিওটি মনে করেন মস্কো হয়তো তার সব বিকল্প প্রস্ত্তত করছে। কিন্তু সামরিক অভিযান নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। তিনি বলেন, নতুন করে কোনো নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক আরো খারাপ করার ঝুঁকি হয়তো পুতিন এখন নিতে চাইবেন না। যদিও ওয়াশিংটন পোস্ট গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, রাশিয়া আগামী বছরের শুরুর দিকে ইউক্রেনে হামলা চালাতে পারে এবং সেই ধরনের প্রস্ত্ততি রয়েছে। এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্েত রুশ সেনার উপস্হিতি চিন্তায় ফেলছে ন্যাটোভুক্ত রাষ্ট্রকে। ২০১৪ সালের ক্রিমিয়া পরিস্হিতি ফিরে আসবে কি না, সেই আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

বিদ্রোহীদের হাতে আটক বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট

ইউক্রেন থেকে মার্কিন কর্মীদের দেশে ফেরার নির্দেশ

করোনা টিকা বাধ্যতামূলক নীতির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনে বিক্ষোভ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

অসলোতে তালেবান ও পশ্চিমা কূটনীতিকদের বৈঠক

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাবেক সিরীয় কর্মকর্তা

সৌদিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাংলাদেশিসহ আহত ২

মার্কিন দূতাবাস কর্মীদের পরিবারকে ইউক্রেন ছাড়ার নির্দেশ