আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশ কার দান একটি মাত্র বাক্যে উত্তর দাও, আমি বলব স্বাধীন বাংলাদেশ বাংলা ভাষার দান। যে সকল তরুণ যুবক জীবন দিয়ে বাংলা ভাষাকে বিলুপ্ত করার হীন ষড়যন্ত্র বানচাল করেছিলেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূলে রয়েছেন তাঁরা। সুতরাং স্বাধীনতা লাভের পর একুশে ফেব্রুয়ারি একটি অতিরিক্ত মর্যাদায় মহিমান্বিত। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু ভাষার সংগ্রামে শহীদের স্মৃতি তর্পণ দিবস নয়, একুশে ফেব্রুয়ারি যাঁরা স্বাধীনতার যুদ্ধে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের বিদেহী আত্মার প্রতি সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধা নিবেদনেরও পবিত্র দিবস।
প্রশ্ন উঠতে পারে ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁরা জীবনপণ সংগ্রাম করেছিলেন তাঁরা কি জানতেন যে ভাষার সংগ্রাম ছিল প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠারও সংগ্রাম? এ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হয় না। ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা ঘটে যায় ফলশ্রুতি দেখতে পাওয়া যায় বহুকাল পরে। জ্ঞানী ব্যক্তিরা হয়তো ঘটনার সুদূরপ্রসারী তাত্পর্য তখন তখনই উপলব্ধি করতে পারেন। অতীত ইতিহাস এ ব্যাপারে ইঙ্গিত দেয়। ১৯৪৮ এবং ১৯৫২ সালের ভাষা সংগ্রামের তাত্পর্যও হয়তো অনেকে তখন উপলব্ধি করে থাকবেন, কিন্তু নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় মুখ খুলে বলেননি। এ কথা সত্য যে যাঁরা ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন—যাঁরা সে-সংগ্রামে শহীদ হয়েছিলেন তাঁদের সকলে না হলেও অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম লীগার এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যে বাঙালি ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল না পঁচিশ বত্সর অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই দ্বিতীয়বার মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার আবশ্যকতা এবং ফলশ্রুতিরূপে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা তার অকাট্য প্রমাণ। (অংশবিশেষ)
লেখকের ‘সোচ্চার উচ্চারণ’ (বাংলা একাডেমি, ১৯৭৭) বই থেকে
