‘আবৃত্তি চর্চার ভেতর দিয়েই ভাষাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা যায়’

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২০:১৬

শিমুল মুস্তাফা। আমাদের দেশে কবিতার হূিপণ্ড বলা হয় তাকে। কারণ তার কণ্ঠেই কবিতা এক অনন্য রূপ পায়। নিজের এই আবৃত্তি সংগ্রাম নিয়ে সারাদেশে অগণিত ভক্ত বা শিষ্যদের কাব্য প্রেমের ঘোরে রাখছেন তিনি বহুকাল। সুনীল, শামসুর রাহমান থেকে শুরু করে একালের কবিরও আকাঙ্ক্ষার জায়গায় থাকে তার কণ্ঠে নিজের কবিতার ছন্দ শোনার। আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসে দেশসেরা এই আবৃত্তিকার বললেন একাধিক প্রসঙ্গ নিয়ে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন তানভীর তারেক

একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে আপনার একটা স্মৃতির কথা একটু শেয়ার করুন—

অগণিত স্মৃতি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ফুল জোগাড় করে শহীদ বেদী সাজানো এবং নিজেরা একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা। এগুলো এ প্রজন্মের ছেলেরা বুঝবে কী করে। এখন সেটা চলে গিয়েছে পোশাকে বা ফেসবুকের ওয়ালে হয়তো একটা শহীদ দিবস নিয়ে গ্রাফিক্স করেই বুঝিয়ে দিচ্ছে।

 

গণমাধ্যমে এখন বাংলা ভাষার চর্চা কেমন হচ্ছে। বিশেষ করে টিভি বা এফএম স্টেশনে...

এটা এক সময় খুব প্রকট ছিল। কিন্তু আমার মনে হয় সচেতনতা বাড়ছে। তবুও অনেক কাজ বাকি। প্রত্যেক সংবাদ পাঠক কী উচ্চারণ শিখে ক্যামেরার সামনে বসছে? যেমন গান খুব জনপ্রিয় একটা মাধ্যম। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আমার সাক্ষাত্ গুরু ছিলেন। তিনি একাধারে শক্তিমান কবি, গীতিকবি, গায়ক। তিনিও তার গানের ক্ষেত্রে উচ্চারণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সচেতন ছিলেন। কারণ একটি জনপ্রিয় মাধ্যমে ভুল উচ্চারণ ছড়িয়ে পড়লে সমাজের বিশাল ক্ষতি হয়ে যায়।

 

কিন্তু গত কয়েকবছর ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের স্পট রিপোর্টিং-এ দেখা গেছে তারা শহীদ দিবস বা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কেই জানেন না—

এটাও অনেকখানি কমেছে। এর প্রকোপ বেড়েছিল ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপে। এটি এখন অনেকখানি কমতে শুরু করেছে। আমার মনে হয় পরিবারে আধুনিক বাবা-মায়েরাও এখন পড়াশোনার পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতি শেখানোর ব্যাপারে মনোযোগী হচ্ছেন। তবুও বলছি সময় লাগবে। গণমাধ্যমকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।

 

কিন্তু কিভাবে...? এখনকার অধিকাংশ নাটকের নাম ইংরেজি শব্দে, ওয়েব সিরিজে তো কথাই নেই—

এগুলো খুব গুরুত্বসহকারে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আমরা যেমন প্রতিটি বিপণী দোকানের সাইনবোর্ডে বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পেরেছি, এটাও আইন করেই করতে হবে। আমি ইংরেজি শব্দের বিরোধী নই। খুব জনপ্রিয় শব্দগুলো আসতেই পারে। কিন্তু নিজেকে বিশাল মাপের আধুনিক প্রমাণ করার জন্য যে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করার চেষ্টা করছি সেখানে সচেতন হওয়া জরুরি। আমি অনেককে দেখেছি এমনিতে আড্ডায় বেশ ভালো বাংলা বলেন। কিন্তু টক শো বা সভা সেমিনারে তার ইংরেজি শব্দের প্রয়োগ বেড়ে যায়। এটা মহা অন্যায়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার ইংরেজির শিক্ষক। ওনার মতো দারুণ ইংরেজি বলা মানুষ কম রয়েছে। অথচ তাকে ২ ঘণ্টা বক্তব্য দিতে বলুন। ১টা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করেই সাবলীল কথা বলতে পারবেন। এখানেই আধুনিকতা।

 

রুদ্র দার কথা যেহেতু এলো। আমরা জানি আপনি তার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কোনো একটা দারুণ স্মৃতি কী আজ বলবেন?

আমি আর আমার বন্ধু সঞ্জীব চৌধুরী ছিলাম তার একনিষ্ঠ ছায়াশরীর। একবার দারুণ এক আড্ডা চলছে টিএসসিতে। হঠাত্ রুদ্র দা কিছু লাইন লিখে সুর আওড়াতে লাগলেন। আমি, সঞ্জীব, শংকর সাঁওজাল একসাথে। আমি তার সুর শুনে বললাম, এটা তো পরিচিত কোনো গানের সুর বলে মনে হচ্ছে। রুদ্র বললেন, না, এটা হতেই পারে না। আমার নিজের টাটকা বানানো সুর এটা। পরে গাইতে লাগলেন। শংকর সাঁওজাল বললেন, এ গানটা আমার। এটা আমি গাইবো। আমরা এভাবেই হয়ে গেলাম ইতিহাসের স্বাক্ষী। কারণ গানটির ছিল ‘ভালো আছি ভালো থেকো।’

 

শেষে জানতে চাই, বৈকুণ্ঠ আপনার একটা স্বপ্ন। এটাকে নিয়ে সুদূর ভাবনা কতদূর?

এটা আমার একটা ব্যক্তিগত আন্দোলনের নাম। আবৃত্তি বা কবিতাকে আমার কণ্ঠে ধারণ করে তাকে জনপ্রিয়তার অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া একদিনে হয়নি। বইমেলায় আমাকে ক্যাসেট বিক্রি করতে দিতো না। আমি স্টল দিয়ে দীর্ঘদিন বিক্রি করেছি। এখন তো কত আজে-বাজে দোকান দেখি। তবে আবৃত্তি চর্চার ভেতর দিয়েই ভাষাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা যায়। এর কোনো উত্কৃষ্ট বিকল্প নেই। তবু আমরা খুব শর্টকাট খুঁজি। অনেকেই আমার কাছে আসেন। বলেন, এ সপ্তাহের ভেতরে আবৃত্তিটা একটু শিখিয়ে দেন। টাকা বেশি দেবো। আমি তখন বলি, তাহলে আরো ২টা দিন বেশি যোগ করে দেন, সাথে নাচটাও শিখিয়ে দিই। এই হলো অবস্থা। ইদানিংকালের কতিপয় কবিদেরও দেখি। আমাকে আবৃত্তির জন্য অনুরোধ করে। ৮/১০টা বই বেরিয়ে গেছে তার। একটা কবিতাও বাছাই করতে যখন না পারি তখন খুব কষ্ট পাই। কারণ ওই কবি কবিতা লিখেনি, কবিতার লাইন ভরাট করেছে। ৩০টা কবিতা হলেই তো ১টা বই। ৬০টায় ২টা। এভাবে বই করার জন্য কবিতা লিখলে কবিতার শরীর তৈরি হয় না। কবিতা লিখে যেতে হয়। ১০০ কবিতা থেকে ১০টা সম্পাদনা করলে সেটা হয়তো কবিতার মানদণ্ডে ফেলানো যায়। কিন্তু আমাদের সেই ধৈর্য্য কোথায়!