১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার আন্দোলনের আহ্বায়ক ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের জন্মভূমি সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার উমরপুর ইউনিয়নের ধুবুলিয়া-শৈলজানা এলাকায় তৈরি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এখনো ভরসা কলাগাছের শহীদ মিনার। ভাষা প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছর পর ২০০৮ সালে প্রশিকার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত শহীদ মিনার এবং তার নামে লাইব্রেরিটি গত ৫ বছর আগে যমুনায় বিলীন হওয়ায় অতীতের কলাগাছের ক্ষণিকের শহীদ মিনার তৈরি করেছে এলাকাবাসী। তবে তার গ্রামের বাড়ি শাহজাদপুর উপজেলার গুদিবাড়িতে দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ বিশ্বাস একটি দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেয়ায় এবার প্রথমবারের মতো যথাযথ মর্যাদা ও উত্সাহ-উদ্দীপনায় আজ পালিত হবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ভাষা দিবস ও জাতীয় শহীদ দিবস।
যার দৃঢ় নেতৃত্বে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” উর্দুকে প্রতিহত করে আন্দোলনে মায়ের ভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, সেই সংগ্রামের আহ্বায়ক প্রয়াত ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন। তার জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ জেলার যমুনা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন জনপদ চৌহালীতে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা যুদ্ধে এলাকার মানুষের অবদান ছিল অনেকটাই স্মরণীয়। ছাত্র মতিনের জন্মস্থান চৌহালী-এনায়েতপুরে এই জনপদে রয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দেশে ভাষা প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছরেও এখানে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি। যে কারণে প্রতিবছর ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাঁশ ও কলাগাছের ক্ষণিকের শহীদ মিনার তৈরি করে শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতো। বিশেষ করে ভাষা মতিনের জন্মভূমি ধুবুলিয়া-শৈলজানা চরে শহীদ মিনার ছিল না বলে সবাই ব্যথিত ছিল। এ নিয়ে দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে প্রশিকার চেয়ারম্যান কাজী ফারুকের সহযোগিতায় শৈলজানা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় চত্বরে জাতীয় নকশাকৃত শহীদ মিনার নির্মাণ এবং লাইব্রেরি বানিয়ে ভাষা মতিনকে দিয়েই উদ্বোধন করানো হয়। এরপর থেকে চরাঞ্চলের মানুষ এই শহীদ মিনারে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষা দিবস পালন করে আসছিল। তবে দুর্ভাগ্যজনক গত ২০১৫ সালের ১ জুন ভাষা মতিনের গ্রামের সেই শহীদ মিনারটি যমুনায় বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে এখানে ভাষা দিবস উদযাপনে ফিরে এসেছে অতীতের সেই সহজলভ্য কলাগাছের ক্ষণিকের শহীদ মিনার। এবার এবার ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদদের স্মরণ করতে ভাষা মতিনের গ্রাম শৈলজানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তৈরি করা হয়েছে কলাগাছের শহীদ মিনার।
কলেজ ছাত্র মনিরুল ইসলাম, রুহুল আমীন, স্কুল ছাত্র এনামুল হক, নাজমুল ইসলাম জানান, ভাষা মতিনের গ্রামে শহীদ মিনার নেই। এই কষ্ট আমাদের পুরো এলাকাবাসীর। তবে ভাষার প্রতিষ্ঠাতার গ্রামে আমরা ভাষা দিবস উদযাপন করবো না এটা হয় না। তাই সেই কলাগাছ দিয়েই আমরা শহীদ মিনার করেছি। এদিকে জন্মভূমির ঘর-বাড়ি যমুনায় বিলীনে ১৯৬৯ সালের দিকে পাশের শাহজাদপুর উপজেলার গুদিবাড়িতে তিনি পরিবার নিয়ে বসতি গড়েন। সেখানেও শহীদ মিনার না থাকায় ক্ষণিকের শহীদ মিনার তৈরি ছাড়া শহীদদের স্মরণে উপায় ছিল না এলাকাবাসীর। এ নিয়েও গণমাধ্যমে লেখালেখি হওয়ায় জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের সহযোগিতায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে গুদিবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কয়েক মাস আগে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনার। তাই এবার এখানে উত্সাহ-উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হবে ভাষা দিবস উদযাপন।
প্রয়াত কিংবদন্তি ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের স্ত্রী গুলবদন নেছা মনিকা, ছোট ভাই গোলাম কিবরিয়া হান্নান জানান, শহীদ মিনারটি গুদিবাড়িতে ছিল বহু প্রতীক্ষার। আশা করবো চৌহালীর ধুবুলিয়াতেও নতুন আরেকটি শহীদ মিনার নির্মাণে আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ভূমিকা রাখবেন।
এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রী জানান, ভাষা মতিনের জন্মভূমি ও গ্রামে শহীদ মিনার নেই জেনে আমিও ব্যথিত হয়েছিলাম। তাই গুদিবাড়িতে একটি শহীদ মিনার তৈরি করেছি। আগামীতে ধুবুলিয়াতেও উদ্যোগ নেয়া হবে।
