সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সদ্য পদত্যাগ করা তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। কানাডায় ঢুকতে ব্যর্থ হয়ে তিনদিনের মাথায় মুরাদ হাসানকে দেশেই ফিরতে হয়েছে। একপ্রকার পালিয়ে গিয়েছিলেন, ফিরেছেনও মুখ লুকিয়ে।
মাথায় কালো টুপি, মুখে কালো মাস্ক ও হুডি দিয়ে পুরো চেহারা ঢেকে রেখেছিলেন তিনি। রবিবার (১২ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় নিজেকে আড়াল করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়েন মুরাদ হাসান। এমনকি ধানমন্ডির নিজের বাসায় না ফিরে উঠেছেন উত্তরায় আত্মীয়ের বাসায়।
একসময় নিজেই যখন সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মানুষকে নিয়ে করেছেন ট্রল-সমালোচনা। এখন সময় ঘুরতেই তিনি এখন ট্রল-সমালোচনার শিকার হচ্ছেন।
বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে সরকারের মন্ত্রিসভার এইরকম উচ্চপদস্থ একজন ব্যক্তির লাগামহীন মন্তব্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অনেকে ক্ষমতার অপব্যবহার বলেই মন্তব্য করেছেন। সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এই রকম আচরণ থেকে আমরা কী শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি সেটিই আলোচনায় এসেছে।
এক সপ্তাহ আগেও তিনি ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিভিন্ন মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দেন। লাগামহীন মন্তব্যের কারণে সমালোচিত হন। এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজন অভিনেত্রীর সঙ্গে কথোপকথনের একটি অডিও প্রকাশের পর আড়ালে চলে যান মুরাদ।
একজন অভিনেত্রীকে তুলে এনে ধর্ষণের হুমকি এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নাতনি জাইমা রহমানকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইটি ছাত্রী হল নিয়ে বেফাঁস মন্তব্যসহ নানা ইস্যুতে বিতর্কে জড়ান মুরাদ হাসান। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সম্প্রতি ছাড়তে হয় প্রতিমন্ত্রীর পদ। এমনকি বহিষ্কার করা হয় দলীয় পদ থেকেও। তবে মুরাদ হাসান প্রতিমন্ত্রী না থাকলেও সংসদ সদস্য রয়েছেন।
নাটকীয় পদত্যাগের পর বৃহস্পতিবার (৯ ডিসেম্বর) কানাডায় উড়াল দিয়েও হয়নি শেষ, প্রবেশ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ৩ দিনের মাথায় আবার দেশেই ফিরতে হয় তাকে। দেশে ফিরলেও সাংবাদিকদের এড়াতে আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ব্যবহার না করে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে মুখে মাস্ক, মাথায় ক্যাপ ও হুডি দিয়ে চুপিসারে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন এই আলোচিত সংসদ সদস্য।
তবে বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে-দেশে ফিরলেও যাননি ধানমন্ডির নিজের বাসায়। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি চলে যান উত্তরায় এক স্বজনের বাসায়।
এদিকে, ডা. মুরাদের সার্বিক বিতর্কিত কাণ্ডের সর্বশেষ নিয়ে অনেককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা গেছে।
ডা. মুরাদ হাসানের সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে ডয়েচে ভেলেকে আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘তথ্য প্রতিমন্ত্রী যিনি ছিলেন এবং চাকরি চলে গেল তার একটা রাজনৈতিক বিচার আমরা হতে দেখলাম। তবে তার কোন আইনি বিচার হয়নি। তিনি যে ভাষা প্রয়োগ করেছেন তাতে দেশের কয়েকটি আইন যেমন-পেনালকোড ও নারী অধিকার নিয়ে সেসব আইন আছে সবগুলোর আলোকে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘তাকে (ডা. মুরাদ হাসান) এভাবে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার মানে হলো-তিনি কালচার অব ইমপিউনিটি এনজয় করলো এবং তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। সে কিন্তু আইনের কোন মুখোমুখি হলো না। তিনি যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো কিন্তু শুধু রাজনৈতিক, সামাজিক শিষ্টাচার বহির্ভূত নয়, সেটি অপরাধমূলকও।’
ডা. মুরাদ হাসানকে নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন।
তিনি ফেসবুকে লিখেন, ‘হয়তো সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান আজ বিকালেই আবার ঢাকাতে পৌঁছবেন। তার ভাগ্যে কি আছে তা জানিনা। হয়তো জেলে যেতে হবে, নয়তো অসহায় হয়ে দেশেই জীবন কাটাতে হবে।
অসহায়ের মত মুখ ঢেকে দেশ ছাড়লেন কানাডা’র উদ্দেশে। করোনার প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র না থাকায় সেখানে ঢুকতে পারলেন না। ফেরত গিয়ে দুবাইতে ঢুকতে পারলেন না ভিসা না থাকায়।
এখন তিনি বিপদগ্রস্থ বলেই হয়তো মায়া লাগছে তার জন্য, আর কোনো কারন নাই। ব্যক্তিগত ভাবেও আমার সাথে তার সম্পর্ক ভালো খারাপের কোনটাই না। হয়তো তিনি সুযোগ পেলে আমার বিরুদ্ধেও লিখবেন। যেমন, আগে অনেককে দিয়ে লিখিয়েছেন।
রাজনীতি করতে গেলে জেল জুলুম থাকে। সংগ্রাম করতে হয়। মাফ মুক্তি চেয়ে, দেশের আইনে যা হয় তা মেনে নিয়ে দেশই এখন তার শেষ গন্তব্য। যুদ্ধাপরাধীদের মতো কুলাঙ্গারা যদি দেশে থাকতে পারে মুরাদ হাসানের সমস্যা কি ?
তবে ওনার বুঝা উচিত, ভদ্র ও বিনয়ী হবার কোনো বিকল্প নেই। বেশি পক পক করা মাছ বরষীতে বেশি ধরা পরে। আর শেখ হাসিনা মাথার উপর থেকে হাত তুলে নিলে কোথাও যে জায়গা হয় না, তাও শিক্ষনীয়।’
এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তীব্র সমালোচনা করেন সিনিয়র সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমান।
তিনি তার ফেসবুক টাইমলাইনে লিখেন, ‘কানাডা তাকে ঢুকতে দেয়নি! দুবাইও না। কলঙ্কের মুখ ঢেকে ঢাকায় ফিরে আত্মগোপনে। আজ দেশের সবচেয়ে নিন্দিত বিতর্কিত মানুষ কার্যত বরখাস্ত তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা: মুরাদ হাসান ।সাতদিন আগেও তার কত দাপট।কি লাজ শরমহীন যৌনবিকৃত চেহারা!কত কুৎসিত কদর্য আচরণ ও কথাবার্তা। তবু ক্ষমতার উগ্র দম্ভে বেহুশ মানুষটির সাথে পাইক পেয়াদা চাকর বাকর চামচা টাউটবাটপারের গিজগিজে ভিড়।কতজন তার মনোরন্জনে কত আয়োজন করতেন। কেউতো বছরের পর বছর পরোক্ষ ক্ষমতার দাপটে ধানমন্ডির ২৭নম্বরে মানুষের ফ্ল্যাট দখল করে মনোরঞ্জনের আয়োজন করে তাকে ডুবিয়ে রাখতেন।
বিনিময়ে কত সুবিধা, জীবিকা নির্বাহ করার ব্যবস্থা করেছেন। আজ কেউ তার পাশে নেই। নি:সঙ্গ পতিত ক্ষমতাহীন একজন বিপদগ্রস্থ মানুষ। আজ কেউ তাকে চিনেনা।কেউ চিনবেনা।ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে দাম্ভিক আচরনে বেপরোয়া চলনে দেউলিয়া এই পতিত নিন্দিত নিগৃহীত মানুষটির পরিনতি দেখে যারা ক্ষমতা বা ক্ষমতার করুনায় অন্ধ তারা পাঠ নিচ্ছেন? বুঝছেন কি ক্ষমতা স্হায়ী নয় যে কোন সময় যে কোন পরিনতি বহন করা লাগতে পারে? সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাদের হেদায়েত করুন যারা এখনো ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ বেপরোয়া।’

মুরাদের বিরুদ্ধে মামলা নেয়নি আদালত