বিজয়নগরে হারিয়ে যাচ্ছে মাটির ঘর

আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:১৫

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ‘গরিবের রাজপ্রসাদ’ খ্যাত মাটির ঘর| রুচিবোধের পরিবর্তন ও পারিবারিক নিরাপত্তার কারণে এখন আর কেউ মাটির ঘরে থাকতে চান না| সচ্ছল মানুষ এখন ঝুঁকে পড়েছেন পাকা দালানের দিকেই| 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় বিজয়নগর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটি ইউনিয়নের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের বাড়িতেই ছিল মাটির ঘর| কিন্তু বর্তমানে সেই অবস্থা আর নেই| দ্রুত বদলে গেছে ঐ পরিবেশ| উপজেলার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, আগে উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নের খাটিঙ্গা, মকুন্দপুর, দাড়িয়াপুর, কামালমোড়া, সেজামোড়া, ভিটি দাউদপুর, দুরানাল ও কচুয়ামোড়া, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর, কালাছড়া, বক্তারমোড়া, ছতরপুর ও দুলালপুর, পত্তন ইউনিয়নের আদমপুর ও শ্রীপুর, হরষপুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া, পাঁচগাঁও, বাগদিয়া, হরষপুর, সোনামোড়া, বড়চাল ও মেঘশিমুল, সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের মেরাশানী, রানুর বাজার, আলীনগর ও কাঞ্চনপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে ছিল মাটির ঘর| বর্তমানে ঐসব গ্রামের হাতেগোনা কিছু বাড়িতে মাটির ঘর থাকলেও অধিকাংশ বাড়িতে নির্মিত হয়েছে দালান ঘর ও সেমিপাকা টিনের ঘর|

এলাকাবাসী জানান, উপজেলার যেসব জায়গায় লাল মাটি ও এঁটেল মাটি পাওয়া যেত সেইসব এলাকার লোকজনই বাড়িতে মাটির ঘর তৈরি করতেন| লাল মাটি ও এঁটেল মাটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে প্রথমে প্যাক করা হতো| পরে সেই প্যাক দিয়ে তৈরি করা হতো ২০-৩০ ইঞ্চি চওড়া দেওয়াল| প্রতি বার এক-দুই ফুট উঁচু করে দেওয়াল তৈরি করে সেই দেওয়ালকে পাঁচ-ছয় দিন রোদে শুকানো হতো| তারপর এই দেওয়াল আবারও এক-দুই ফুট উঁচু করে শুকানো হতো| এভাবে পর্যায়ক্রমে ১০-১২ ফুট উঁচু দেওয়াল নির্মাণ করা হতো| পরে এই দেওয়ালের ওপর টিনের চালা বা ছন দিয়ে চালা (ছাউনি) নির্মাণ করা হতো| প্রতিটি ঘর নির্মাণ করতে সময় লাগতো প্রায় দুই-তিন মাস| বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঘরের ভেতরের দিকে ধানের তুষ (কুড়া) দিয়ে দেওয়ালের ওপর প্রলেপ দেওয়া হতো| বাইরের দিকে দেওয়া হতো চুনের প্রলেপ বা আলকাতরা| চুনের প্রলেপ দিলে ঘরের সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পেত তেমনি ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকেও মাটির দেওয়াল রক্ষা পেত| বন্যা বা ভূমিকম্প না হলে এসব ঘর শতাধিক বছর পর্যন্ত টিকে থাকত| মাটির ঘর নির্মাণের কারিগরদের বলা হতো দেয়ালী| উপজেলার হরষপুর ইউনিয়নের নিদারাবাদ গ্রামের দেয়ালী নোয়াজ আলী জানান, মাটির ঘর তৈরি করার উপযুক্ত সময় হচ্ছে কার্তিক মাস| কারণ এই সময় বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না| তিনি বলেন, আমরা প্রতি হাত ঘর নির্মাণে ১০ টাকা করে নিতাম| আবার অনেক সময় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা চুক্তিতেও ঘর নির্মাণ করে দিতাম| তিনি বলেন, মানুষ এখন আর মাটির ঘর নির্মাণ করে না, তাই আমরা এই পেশা ছেড়ে দিয়েছি|

উপজেলার বিষ্ণুপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আকতার হোসেন খান বলেন, আগে আমাদের গ্রামের প্রতি বাড়িতেই মাটির ঘর ছিল| বর্তমানে মাটির ঘরের সংখ্যা খুবই কম| লাল মাটি ও এঁটেল মাটির অভাব, কারিগর সংকটের কারণে মানুষ এখন আর মাটির ঘর তৈরি করতে চায় না| তাছাড়া গ্রামের মানুষ বিদেশে গিয়ে এখন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল| তাদের রুচিবোধেরও পরিবর্তন হয়েছে| তিনি বলেন, বাড়িতে একটি দালান থাকাটা অনেকেই স্ট্যাটাসের অংশ হিসেবে মনে করেন| এ ব্যাপারে বিজয়নগর উপজেলার সিঙ্গারবিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, মানুষ এখন কর্মমুখী| মানুষের আয়-রোজগার বাড়ার কারণে দিনদিন শৌখিন হয়ে উঠছে| এছাড়া এলাকার প্রচুর মানুষ বিদেশ গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়েছেন| এলাকার প্রবাসীরা ও সচ্ছল ব্যক্তিরা তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে মাটির ঘরে থাকতে চায় না| এজন্য মাটির ঘর ভেঙে পাকা দালান, সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করছেন|

 

ইত্তেফাক/এমএএম