যেসব কবিতা ও গান ছিল বারুদে ঠাসা 

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:৫৯

পৃথিবীর সকল জাতির বিজয় দিবস থাকে না। আমাদের আছে। অভাবিত রক্তক্ষয়ের ভেতর দিয়ে আমাদের ঘরে আসন পেতেছে বিজয়ের রাজটিকা। এই পৃথিবীতে যুক্তরাষ্ট্রের পরে কেবল বাংলাদেশই ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল এবং বিজয় অর্জন করেছিল।

বাঙালি জাতির বিজয় অর্জনের মূলে ছিল পাকিস্তানের মতো একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের বিপরীতে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। বাংলাদেশ আজ যা যা কিছু অর্জন করেছে তার নেপথ্যে রয়েছে সকল স্তরের মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিসংগ্রামে নিবেদিত ত্রিশ লাখ শহিদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভম। আমাদের আত্মবিকাশের ধারার চূড়ায় রয়েছে একাত্তরে বিজয় অর্জন।

এই অর্জনের ঐতিহাসিক ঘটনাটি বাংলাসাহিত্যের এক মহান উপজীব্য বিষয়—যা মূলত কবি আবদুল হাকিম, ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর থেকে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত হয়ে মুকুন্দ দাস, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সুকান্তের উত্তরাধিকার বহন করে প্রবাহিত হচ্ছে।

বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ঘটনা গল্প-উপন্যাস-কবিতা-গানে ব্যাপকভাবে উঠে এলেও এখনো তাত্পর্যপূর্ণ অনেক মানোত্তীর্ণ রচনাই লেখা বাকি রয়েছে। এ এক বিশাল শস্যখেত, এখানে ফলনের জন্য রয়েছে অবারিত জমিন। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বেশি স্পন্দিত ক্ষেত্রটি হলো কবিতা ও গান। গল্প-উপন্যাস বিপুল সংখ্যায় লেখা হলেও আমাদের সীমিত অংশে আজ কেবল মুক্তির কবিতা আর গান নিয়ে অল্প কিছু বলা যেতে পারে। চীনা কথাশিল্পী লু শুন যদিও বলেছেন, ‘কবিতা লিখে বিপ্লব করা যায় না, বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন বন্দুকের।’ তারপরও এ কথা ঠিক—বন্ধুকই একটি যুদ্ধজয়ের শেষ কথা নয়।

যুদ্ধ জয়ের জন্য যেমন বন্দুক চাই, তেমনি চাই কবিতা ও গান। মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও সুকান্তের কবিতা মুক্তিবাহিনীর ভেতর সীমাহীন প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছিল। একইসঙ্গে যুদ্ধের সময় ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে রচিত কিছু কবিতা ও গান আমাদের রক্তের চাঞ্চল্য বাড়িয়ে দেয়।

শামসুর রাহমানের ‘সন্ত্রাসবন্দি বুলেটবিদ্ধ দিনরাত্রি’ কবিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের কথা বর্ণিত হয়েছে অসাধারণ কাব্যিকতায়—‘কখনো নিঝুম পথে হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে কেউ গুলির আঘাতে/মনে হয় ওরা গুলিবিদ্ধ করে স্বাধীনতাকেই/দিন-দুপুরেই জিপে একজন তরুণকে কানামাছি করে নিয়ে যায় ওরা/মনে হয় চোখ-বাঁধা স্বাধীনতা যাচ্ছে বধ্যভূমিতে।’ কবি হেলাল হাফিজের বজ্রঘোষিত ভাষা—‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ হাসান হাফিজুর রহমান তাঁর ‘গেরিলা’ কবিতায় লিখলেন—‘বাংলার আপদে আজ লক্ষ কোটি বীর সেনা/ঘরে ও বাইরে হাঁকে রণধ্বনি একটি শপথে/আজ হয়ে যায় শৌর্য ও বীরগাথার মহান/সৈনিক, যেন সূর্যসেন, যেন স্পার্টাকাস স্বয়ং সবাই।’ ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ শিরোনামে নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন করোটি ঝংকৃত কবিতা।

আমরা আরো অসংখ্য কবির নাম উচ্চারণ করতে পারি, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করতে পারি। এর যেন শেষ নেই। তার ভেতরেই জসীম উদ্দীনের ‘মুক্তিযোদ্ধা’, সুফিয়া কামালের ‘উদাত্ত বাংলা’, আহসান হাবীবের ‘স্বাধীনতা’, সিকান্দার আবু জাফরের ‘বাংলা ছাড়ো’, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবন্তির কথা বলছি’, আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘মুক্তিযুদ্ধ’, মহাদেব সাহার ‘ফিরে আসা গ্রাম’, হুমায়ুন আজাদের ‘মুক্তিবাহিনীর জন্যে’, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’, আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কবিতার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অসংখ্য রুধির-উজ্জীবিত গান পরিবেশন করা হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে প্রচার হওয়া গানগুলো ছিল গণজাগরণের মূল হাতিয়ার। এসব গানের মধ্যে অন্যতম হলো—‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। গানটি ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সিগনেচার টিউন, গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা। সুর করেন আনোয়ার পারভেজ। কণ্ঠ দিয়েছিলেন শাহনাজ রহমতউল্লাহ ও মোহাম্মদ আবদুল জব্বার। গানটি তৈরি হয়েছিল একাত্তরের আগে ‘জয় বাংলা’ সিনেমার জন্য।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ কয়েকজন শিল্পীর সমবেত কণ্ঠে প্রচারিত হয়। ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল রক্ত লাল’, ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’—এই গান তিনটির গীতিকার গোবিন্দ হালদার। প্রথম গানটির সুরকার সমর দাস এবং পরের দুটি আপেল মাহমুদের সুরারোপিত। প্রথম দুটি গান সমবেত কণ্ঠে গীত এবং শেষের গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আপেল মাহমুদ। ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এ গানের লেখক ফজল-এ-খোদা এবং সুরারোপ করেন ও কণ্ঠ দেন মোহাম্মদ আবদুল জব্বার।

এই গানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি জড়িত—তাঁর নির্দেশেই স্বাধীন বাংলা বেতারে যাওয়ার আগেই গানটি রেকর্ড হয়ে প্রচার শুরু হয়েছিল। আপেল মাহমুদের লেখা ও সুরে ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে’ গানটি যৌথ কণ্ঠে গীত। রথীন্দ্রনাথ রায় নিজের সুরে গেয়েছেন ‘ছোটদের বড়দের সকলের’। এই গানটি লিখেছেন রংপুরের তিন বন্ধু মিলে।

তাঁদের নাম আলী, মোহসীন ও রেজা। ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’ গানটির রচয়িতা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। এ গানে সুরারোপের পাশাপাশি কণ্ঠ দেন অংশুমান রায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছাড়াও বাংলার হাটে-মাঠে-ঘাটে স্বভাব গায়ক-বয়াতীরা মুক্তিযুদ্ধের গান শুনিয়ে সাধারণ জনতাকে উজ্জীবিত রেখেছেন।

এসব গান আর কবিতা ছিল বারুদে ঠাসা, যুদ্ধের অতি গুরুত্বপূর্ণ রসদ।

ইত্তেফাক/এএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন