প্রায়ই এই রকম একটা কথা শুনি যে আমাদের ছেলে-মেয়েরা নাকি আজকাল আর বই-ই পড়ে না। তারা ব্যস্ত থাকে মোবাইল, ফেসবুক, ইন্টারনেট ইত্যাদি নিয়ে। অমর একুশে বইমেলাতে গেলে এই কথাটা আমার বিশ্বাস হয় না। মায়েদের দেখি তাঁরা তাদের শিশু-কিশোর ছেলেমেয়েদের নিয়ে মেলায় আসছেন, বাবারা আসছেন। বাচ্চারা তাদের মনের মতো বই ঘাঁটাঘাঁটি করছে। ব্যাগ ভরে ভরে বই নিয়ে যাচ্ছে। তরুণ-তরুণীরা কিনছে, বয়স্কজনেরা কিনছেন। মেলায় তিল ধারণের ঠাঁই থাকছে না। বইয়ের দোকানগুলো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। বই যদি পড়াই না হয় তাহলে এইসব বই আমাদের ছেলেমেয়েরা কেন কিনছে? শুক্র-শনিবার মেলায় ‘শিশু প্রহর’ থাকে। শিশু প্রহর মুখর হয়ে থাকে হাজার হাজার শিশু-কিশোরের আনাগোনা আর হৈ-হল্লায়। বই কিনছে, মজা করছে, প্রিয় লেখকের অটোগ্রাফ নিচ্ছে, ছবি তুলছে। সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য।
আমার লেখক জীবন শুরু হয়েছিল ছোটদের লেখা লিখে। এই বছর লেখক জীবনের পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্ণ হলো। এখনও বড়দের লেখার পাশাপাশি বছরে অন্তত ৩/৪টা ছোটদের বই আমি লিখি। মেলায় বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোর পাঠকদের সঙ্গেও আমার অনেক কথা হয়। আমার অনেক লেখা নিয়েই তারা জানতে চায়, নানা রকম প্রশ্ন করে। কিশোরদের জন্য আমার একটা সিরিজ আছে ‘ভূতের নাম রমাকান্ত কামার’। ‘রমাকান্ত’কে নিয়ে তিনটি লেখা এই পর্যন্ত লিখেছি। গত বছর লিখেছিলাম ‘রমাকান্ত ও সতেরোটি বাচ্চাকাচ্চা’। এবার ‘রমাকান্ত’কে নিয়ে লিখতে পারিনি। এই নিয়ে ছোটরা অনেকেই প্রশ্ন করেছে, কেন ‘রমাকান্ত’কে নিয়ে লিখিনি? আমি তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি এই বলে যে, এবার আমি মুক্তিযুদ্ধের একটি বড় উপন্যাস ‘একাত্তর ও একজন মা’ নিয়ে খুব ব্যস্ত ছিলাম। আগামী বছর থেকে অবশ্যই ‘রমাকান্ত’কে নিয়ে লিখবো। তবে তোমাদের জন্য ‘কলাপাতা ও লাল জবাফুল’ নামে যে বইটা লিখেছি সেটা পড়ে দেখো।
মেলায় এসে কোনও কোনও মা-বাবা নিজের জন্য আমার কোনও বই কেনেন, সঙ্গের ছেলেমেয়েদেরও আমার লেখা তাদের উপযোগী বই কিনে দেন। এক ফাঁকে বলেন, আমরা আপনার বই পড়ে বড় হয়েছি এখন আমাদের ছেলেমেয়েরাও আপনার বই পড়ছে। শুনে খুব গৌরববোধ করি এই ভেবে যে তিনটি প্রজন্মকে আমি আমার বই পড়াতে পারছি।
বইয়ের চেয়ে ভালো বন্ধু আর কিছু নেই। একটি ভালো বই একজন মানুষকে আদ্যপান্ত বদলে দিতে পারে। একটি ভালো বই সারাজীবনের সঙ্গী হয়ে থাকে। সুতরাং যাঁরা মেলায় যাচ্ছেন তাঁরা প্রত্যেকে অন্তত একটি ভালো বই কিনুন। প্রিয়জনের হাতে বই তুলে দিন। এমনকি অপ্রিয়জনের হাতেও বই তুলে দিন। বইয়ের আলোয় নিজে আলোকিত হোন, অন্যকে আলোকিত করুন। লেখক :কথাসাহিত্যিক
