জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার চত্ত্বরের একপাশে আড্ডায় মেতেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে শেষ বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী। নৃবিজ্ঞান বিভাগ সম্পর্কে কথা হলো হাফিজ, আফিয়া, রিদোয়ান, আঁখি এবং মার্জিয়ার সাথে। নৃবিজ্ঞান বিভাগ সম্পর্কে তারা বলেন, ‘ভর্তি হবার আগে আমাদের তেমন কোনো ধারণা ছিল না নৃবিজ্ঞান সম্পর্কে। অথচ ইতোমধ্যেই অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে ফেলেছি। এখন নৃবিজ্ঞান একটা ভালবাসার জায়গা।'
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নৃবিজ্ঞানের চাহিদা ব্যাপক। বাংলাদেশে খুব বেশিদিনের না হলেও, এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নৃবিজ্ঞান হচ্ছে মানুষ সম্পর্কিত বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির গবেষণা। বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা মানুষের সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে এই বিজ্ঞান খুবই গভীরভাবে গবেষণা করে। ভিন্ন ভিন্ন সমাজের মানুষ ও তাদের সব রকমের অভিজ্ঞতা নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়। লক্ষ কোটি বছর ধরে মানুষের বিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের গবেষণাও নৃবিজ্ঞানের আওতার অন্তর্ভূক্ত। নৃবিজ্ঞানে মানুষকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গবেষণা করা হয়। নৃবিজ্ঞানীরা কোন একটি বিশেষ মানবসম্প্রদায়ের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ চিহ্নিত করতে ও সেগুলি ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেন।
নৃবিজ্ঞান সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ব্যাখা দিতে গিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রওনক জাহান আফিয়া বলেন, ‘নৃবিজ্ঞান মানুষ এবং তার সংস্কৃতিকে জানবার এবং বুঝবার এক অনন্য মাধ্যম। নৃবিজ্ঞানের শাখাসমূহ মানব সম্পর্কিত সমসাময়িক, ঐতিহাসিক এবং প্রাগৈতিহাসিক ঘটনাবলীকে অধ্যয়ন করে থাকে। সর্বোপরি নৃবিজ্ঞান পাঠ করে মানুষের ভিন্ন ভিন্ন সত্ত্বা ও সংস্কৃতিকে জানার মধ্য দিয়ে মানবিকতার অন্য এক স্তরে উত্তরণ সম্ভব।’
বাংলাদেশের ৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগ চালু রয়েছে। সর্বপ্রথম ১৯৮৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগটি চালু করা হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ বোরহানুদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজে এ বিভাগটি চালু হয়। এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগটি চালু হয় ২০০৮ সালে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও এ বিভাগটি চালু করার কথা চিন্তা করা হচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ানো হচ্ছে এ বিষয়টি।
পৃথিবীর বিভিন্ন নামিদামি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান আজ প্রথম সারিতে। চাকুরির বাজারের ক্ষেত্রে এই বিভাগের পরিধিও ব্যাপক। মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত সকল বিষয় নিয়ে কাজ করা নৃবিজ্ঞানের স্বভাব। তাই দেশের বাইরে নৃবিজ্ঞানকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের এ বিষয়ে ভর্তি হবার আগে এবং ভর্তি হবার কিছুদিন পর পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বেশ খানিকটা হতাশায় ভোগেন। কারণ অনেকেই এই বিষয়টি সম্পর্কে ঠিকমত জানেন না। তারা গতানুগতিক বিষয়ের সাথে এই বিষয়কে মেলাতে পারেন না। তারা মনে করেন এর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু আশার কথা হল, এই বিষয়ের ক্ষেত্রে আছে বহুমুখি পেশা। এত পেশা অন্যকোনো ডিসিপ্লিনে নেই। পেশাগুলো বেশ খানিকটা উপভোগ্য।
এই বিষয়ে পড়ে বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশাসনিক সেক্টরে চাকরি করা যায়। প্রত্নতত্ত্ব, স্বাস্থ্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গণমাধ্যম, সামাজিক সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা, পরিবেশ ও প্রতিবেশমূলক, জাদুঘর, প্রজেক্ট ডিজাইন, জানস্বার্থে উন্নয়ন প্রজেক্ট, অপরাধ বিষয়ক, ফরেনসিক বিভাগ, বিমান শিল্প, গার্মেন্টস শিল্প, মনোবিদ্যা, জৈবপ্রযুক্তি, রোগতত্ত্ব ইত্যাদি সেক্টরে কাজের সুযোগ রয়েছে। পেশার এসব সেক্টরগুলো নৃবিজ্ঞানীর জন্য উপযোগী।
নৃবিজ্ঞান পড়ার পরে কোন কোন পেশাতে অর্ন্তভুক্ত হওয়া যায়—এ বিষয়ে এই বিভাগের নবম ব্যাচের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান মৃদু বলেন, ‘বাংলাদেশসহ সারাবিশের জ্ঞানকান্ডে নৃবিজ্ঞান ভীষণভাবে সমাদৃত। নৃবিজ্ঞানীরা মানব সম্পর্কিত যেকোন প্রতিষ্ঠানে তাদের জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ দেখাতে সক্ষম। নৃবিজ্ঞান পাঠ শেষে একজন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেন, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করতে পারেন অথবা নৃবিজ্ঞানী হিসেবে নিজের পছন্দমাফিক কাজ বেছে নিতে পারেন। এছাড়াও জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন এনজিও ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিজের কর্মসংস্থান করতে পারেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে—স্থাপত্য বা প্রকৌশলের শিক্ষার্থীদেরকেও নৃবিজ্ঞান পড়ানো হয়, সে কারণে শিক্ষকতার সুযোগ তো থাকছেই।
সর্বোপরি, নৃবিজ্ঞানের গবেষণা মানুষকে সহিষ্ণু করতে সাহায্য করতে পারে। অন্য জাতির লোক কেন সাংস্কৃতিক ও দৈহিক দিক থেকে আলাদা আচরণ করে, নৃবিজ্ঞান তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেয়। যেসব সাংস্কৃতিক রীতিনীতি ও কাজকর্ম আমাদের কাছে ভুল বা অশোভন মনে হতে পারে, সেগুলি হয়ত বিশেষ পরিবেশগত বা সামাজিক অবস্থার জন্য অভিযোজনের ফসল।
