ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিকাশ ও ক্যাশলেস সোসাইটি 

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:৩৪

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ দার্শনিক প্রত্যয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১২ ডিসেম্বর ২০০৮, যখন বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা গড়ার’ দৃঢ় অঙ্গীকারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ইশতেহার ‘ভিশন টোয়েন্টি টোয়েন্টি ওয়ান’ বা ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করে। সেই নির্বাচনি অঙ্গীকারে বলা হয়, ‘২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত হবে। একটি উন্নত দেশ, সমৃদ্ধ সমাজ, একটি ডিজিটাল যুগের জনগোষ্ঠী, রূপান্তরিত উৎপাদন ব্যবস্হা, নতুন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি সব মিলিয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন নির্বাচনি ইশতেহারে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর ঘোষণা করেন তখন অনেকেই বিষয়টি নিয়ে উপহাস করে বলেছে, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ একটি আষাঢ়ে গল্প। তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ বেশ কিছু সংস্হা এবং গণমাধ্যমও এই রূপকল্পের সমালোচনা করে বলেছিল, ‘তারা দিবাস্বপ্ন দেখছে এবং দেখাচ্ছে।’ কিন্তু তাদের সবার যুক্তি ও ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ আজ অনন্যবিপ্লব রচনা করেছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের চমকপ্রদ উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে দেশের সামগ্রিক আর্থিক লেনদেন কার্যক্রমে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনে নতুন এক বিপ্লব ঘটেছে। প্রান্তিক মানুষও এখন ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে স্বাচ্ছন্দ্য ও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দারুণ এক বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে বলা যায়। দেশের বর্তমান এমএফএস-এ অ্যাকাউন্ট প্রায় ১২ কোটি। এর মধ্যে সক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৫ কোটির বেশি। বিকাশের মাধ্যমে খোলা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ৬ কোটির মতো, আর নগদের অ্যাকাউন্ট সাড়ে ৫ কোটি। রকেটের মাধ্যমেও খোলা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা আড়াই কোটির মতো। তবে একজন মানুষ একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারও করছেন। দেশের সব মানুষের হাতে এই সেবা পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্নমুখী প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। বাংলাদেশ এখন হাতে হাতে নগদ লেনদেনের বদলে নগদবিহীন আর্থিক লেনদেনের অর্থাত্ ক্যাশলেস সোসাইটির কথা ভাবছে। নগদ লেনদেনের ঝুঁকি ঝামেলা ও বিড়ম্বনা এড়াতে ডিজিটাল মানি ট্রান্সফারে ঝুঁকে পড়ছেন দেশের মানুষ। এটা ডিজিটাল বাংলাদেশের উজ্জ্বল এক প্রকাশ। ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল শহরে কেন্দ্রীভূত নেই এখন। গ্রামের সাধারণ মানুষও এর সুফল পাচ্ছেন। আজ ২০২১ সালের শেষে এসে আমরা বলতে পারছি, ডিজিটাল বাংলাদেশের সেই স্বপ্ন এখন আমাদের কাছে বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ মূলত আধুনিক বাংলাদেশের দৃষ্টি ও দর্শন।

দেশের ৩ কোটি পিছিয়ে পড়া মানুষকে গত এক বছরে সাড়ে ৮ কোটি বার সরকারের বিভিন্ন ভাতা ও অনুদান বিতরণ করেছে নগদ। শুধু নগদ নয়, বিকাশের মাধ্যমেও সরকারি ভাতার একটি বড় অংশ বিতরণ করা হচ্ছে। আর্থিক অন্তভু‌র্ক্তির ওপর ভর করেই করোনা মহামারির সময়ে নগদের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য আর্থিক অনুদান ও সহায়তা বিতরণ প্রক্রিয়াকে ডিজিটালাইজড করতে পেরেছে সরকার। এখন প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন উত্সবে যে উপহার দেন, সেটাও এমএফএসের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মানুষের হাতে। এতে স্বচ্ছতাও যেমন বেড়েছে তেমনিভাবে সাধারণ মানুষের হয়রানি ভোগান্িত কমেছে। একসময় এই সরকারি ভাতা সুবিধাভোগীদের হাতে পৌঁছানো নিয়ে অভিযোগের শেষ ছিল না। বহু অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মায়ের মোবাইলে চার বার করে উপবৃত্তির টাকা পাঠানো হয়েছে। এটা যুগান্তকারী একটি ব্যাপার সন্দেহ নেই। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে উপবৃত্তি বিতরণের বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘটনা বাংলাদেশেই ঘটেছে। তাছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৫৮ লক্ষ দুস্হ ও হতদরিদ্রের ভাতাও দেওয়া হয়েছে এভাবেই। এই দুটি বড় কর্মসূচির মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে দেশের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল সেবার আওতায় নিয়ে আসতে সক্ষম ও সফল হয়েছে সরকার।

ডিজিটাল বাংলাদেশ যুগে প্রবেশের কারণে আমাদের জীবনযাপন অনেকটা পালটে গেছে। দেশে বর্তমানে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়েছে। দৈনিক মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ কোটি টাকা। আমাদের ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী স্বপ্ন হচ্ছে দেশের সব ফাইন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন ক্যাশলেস হয়ে যাবে। নগদ অর্থে আর লেনদেন হবে না, উন্নতির ধারাবাহিকতায় এমন পরিবেশের দিকে বাংলাদেশ যাচ্ছে। ক্যাশলেস সোসাইটি হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত্। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে মাত্র ৫ সেকেন্ডে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স গ্রহীতার অ্যাকাউন্টে জমা হবে। সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা এই সেবা পাওয়া যাবে। এতে সাধারণ মানুষ তাদের মোবাইল ফোনে টাকা পাবে। যে টাকাটা তারা একটা দোকানে গিয়ে খরচ করবে, সেটাও তারা মোবাইলে পেমেন্ট করে দেবে। তাদের হাতে আর ক্যাশ রাখার প্রয়োজন হবে না। তাদের কষ্ট করে আয় করা টাকাটা তাদের থেকে কেউ চুরি করে নেবে না। ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ হলে দুর্নীতি নির্মূলেও তা ভূমিকা রাখবে। আজ বাংলাদেশের ৫ কোটি মানুষের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। তারা সম্পূর্ণ ক্যাশের ওপর নির্ভরশীল। তবে এই ক্যাশ টাকা তো চুরি হতে পারে। তাদের টাকা লুট হতে পারে; দুর্নীতির সুযোগ থাকে।

দেশের বেশির ভাগ মানুষের হাতে এখন মোবাইল ফোন থাকায় ডিজিটাল ফাইন্যান্স পরিচালনা সুবিধাজনক হয়েছে। ডিজিটাল ফাইন্যান্স অনুন্নত গ্রামীণ জীবনে অত্যাধুনিক আর্থিক লেনদেন সেবাকে সহজলভ্য করেছে, যা গতানুগতিক, প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্হায় সম্ভব ছিল না। গ্রামীণ দারিদ্রে্যর মোকাবিলায় সরকারি নানা উদ্যোগ, প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী এবং গতিশীল করেছে অন্তভু‌র্ক্তিমূলক ডিজিটাল ফাইন্যান্স। এর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হচ্ছে। গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক কিংবা দুগ্ধ উত্পাদনকারী খামারি অথবা মত্স্যচাষি, হাঁসমুরগির খামারের মালিক প্রত্যন্ত দূরবর্তী গ্রামে বসেই মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা ভোগ করার মাধ্যমে তার উত্পাদিত কৃষিপণ্যের মূল্য জেনে যাচ্ছেন অল্প সময়ের মধ্যে। এভাবে উদ্ভাবনী ক্ষমতার চর্চা এবং ডিজিটালাইটেজেশন বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করবে, আশা করা যায়। উচ্চাভিলাসী হলেও সরকারি এবং বেসরকারি নানা উদ্যোগ এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিচ্ছে। নগদ, বিকাশ, রকেট, ডাচ বাংলা ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং প্রভৃতির সুবাদে মাইক্রোফাইন্যান্স এখন অনেকটাই সহজ এবং সাফল্যময় হয়ে উঠেছে। তাছাড়া নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি দূর করেছে ইলেকট্রনিক ব্যাংকিং। ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, ভিসা কার্ড ইত্যাদির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল ফাইন্যান্সের ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রমাণ মেলে।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন