মহানন্দার শীতল জলে জীবিকার লড়াই

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০৮:১৫

পেটের ক্ষুধা মেটাতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীর ঠান্ডা পানিতে ডুবে ডুবে পাথর তুলছেন হাজার হাজার শ্রমিক। প্রচণ্ড শীতেও জীবিকার তাগিদে তাদের বাধ্য হয়ে নামতে হয় শীতল পানিতে। সন্ধ্যায় উত্তোলিত পাথর মহাজনের কাছে বিক্রি করে চলে সংসার। এ যেন বরফ জলে জীবিকার লড়াই। এ চিত্র দেশের উত্তরের সীমান্ত প্রবাহিত নদী মহানন্দার।

তেঁতুলিয়ার দেড় লাখ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক পাথরশ্রমিক। এ পাথর উত্তোলিত হচ্ছে নদী থেকে। দুই সীমান্তের বুক চিরে প্রবাহিত নদী মহানন্দায় হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকার বিশাল ভান্ডার। কেউ কেউ ভাগ্যদেবতাও মনে করে মহানন্দাকে। প্রতিদিন লাখ লাখ সিএফটি নুড়ি পাথর তোলা হচ্ছে এ নদী থেকে। ভোর সকালে বরফগলা ঠান্ডা পানিতেই শ্রমিকরা দল বেধে হাওয়ায় ফুলানো গাড়ির টিউব, লোহার জাকলা, চালুনি ও লোহার রড নিয়ে নেমে পড়ছে নদীতে। দিনভর চলে পাথর উত্তোলন। সে পাথর ভাসানো টিউবের ঢাকিতে করে নদীর কিনারে এনে সেখান থেকে নদী তীরে স্তূপ করা হয়। সন্ধ্যায় মহাজনের কাছে বিক্রি করে মজুরি হিসেবে মিলে ৫০০-৭০০ টাকা। কথা হয় পাথরশ্রমিক বারঘরিয়া গ্রামের মধ্যবয়স্ক আব্দুল মালেকের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘ভাই এই মহানন্দা নদীডাই হামাগ বাঁচাই রাখছে। পানিখান বরফের মতো ঠান্ডা ভাই। কাম না করলে খাম কী।’

এই কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাকির নামের আরেক শ্রমিক জানান, ঘরে স্ত্রীসহ চার ছেলেমেয়ে। সন্তানের ভরণপোষণ চলে এই পাথর জীবিকার ওপর। দিনভর দলের সঙ্গে ঠান্ডা পানিতে পাথর তুলে সন্ধ্যায় পারিশ্রমিক নিয়ে পরিবারের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করেন। এত ঠান্ডা পানিতে কাজ করছেন, অসুখ হয় না? প্রশ্ন করলে রহিম নামের আরেক শ্রমিক জানান, ‘হ্যাঁ ভাই, সর্দি-জ্বর তো হচে। কয়দিন জ্বরে ছিনু। কাম না করে উপায় নাই।’

পাথরশ্রমিক ছাড়াও এ নদীর তীরে পাথর নেটিং, শোটিং ও ক্রাশিংয়ের কাজ করছে শত শত নারী পাথরশ্রমিক। তেঁতুলিয়া থেকে বাংলাবান্ধা স্হলবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার নদীর তীরসহ সড়কের উভয় পার্শ্বে চলে পাথর লোড-আনলোড, নেটিং, শোটিং ও ক্রাশিংয়ের কাজ। কথা হয় ক্রাশিং মেশিনে পাথর ভাঙা কাজে নিয়োজিত জরিনা খাতুনের সঙ্গে।

তিনি জানান, ফজরের আজান শুনে ঘুম থেকে উঠতে হয়। তাড়াহুড়ো করে রান্না করে সন্তানদের খাইয়ে বের হতে হয়। দেরি করে কাজে পৌঁছালে শুনতে হয় মহাজনের গালি। কোনো কোনো দিন দেরি করার কারণে কাজেই নেওয়া হয় না।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহাগ চন্দ্র সাহা জানান, শীত মৌসুমে এ উপজেলায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করে। ফলে কনকনে ঠান্ডার মধ্যেই মহানন্দা নদী থেকে শ্রমিকরা পাথর তুলে জীবিকানির্বাহ করেন। শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের শীত মোকাবিলার জন্য উপজেলা প্রশাসনের সব রকম প্রস্ত্ততি রয়েছে।

ইত্তেফাক/বিএএফ