বন্ধুমহলে সালাম ছিলেন খুবই জনপ্রিয়

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:৪৮

অর্ণব দাস

ভাষা শহিদদের নামের ক্ষেত্রে প্রথমে যে নামটি আসে তা হলো সালাম। পুরো নাম মো. আবদুস সালাম। ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনী জেলার দাগনভুঁইয়া উপজেলার লক্ষণপুর গ্রামে জন্ম হয় এই মহান ভাষা সৈনিকের। যাঁর অসীম সাহস ও দেশপ্রেম সৃষ্টি করেছে এক বিরল দৃষ্টান্ত।

সালামের বাবা আবদুল ফাজেল মিয়া ছিলেন একজন দরিদ্র কৃষক, যিনি সামান্য জমিজমার পাশাপাশি বর্গাচাষ করে কষ্টে সংসার চালাতেন। মা দৌলতের নেছা ছিলেন গৃহিণী। সালামের শৈশব কাটে লক্ষণপুর গ্রামে। অল্প বয়সেই ভর্তি হন কৃষ্ণরামপুর প্রাইমারি স্কুলে। শান্তশিষ্ট সালাম লেখাপড়ায় ভালো হওয়ায় শিক্ষকদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। বন্ধুমহলেও তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে ভর্তি হন তত্কালীন মাতুভুঁইয়া কলিমুল্লাহ মাইনর স্কুলে। এ স্কুলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে ভর্তি হন দাগন ভুঁইয়া আতাতুর্ক হাই  স্কুলে। বাড়ি থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে স্কুল।  কখনো কাঁচা রাস্তা আবার কখনো খেতের আল ধরে হেঁটে স্কুলে গেলেও ক্লাস ফাঁকি দিতেন না কখনো।

চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সালাম ছিলেন সবার বড়। সংসারের অভাব-অনটন ও দুঃখ-কষ্ট তাই এই বালককে ক্রমেই ভাবিয়ে তোলে। একদিন সংসারের দৈন্যদশা লাঘবের উদ্দেশ্যে কাউকে না জানিয়ে পাড়ি দেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। সেখানে ভগ্নিপতি আবদুল কাদেরের সহায়তায় ১৯৪৬ সালের প্রথম দিকে শিল্প দপ্তরের রেকর্ড কিপারের চাকরি পান। স্বল্প বেতনের এই আয় থেকে প্রতি মাসেই টাকা পাঠাতে থাকেন বাবা-মায়ের কাছে।

১৯৪৭ সাল। প্রায় দু’শ বছরের শাসনের পর বিভক্ত হলো ভারতবর্ষ। ১৪ আগস্ট বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিলো পাকিস্তান। বুকভরা আশা নিয়ে সদ্যস্বাধীন দেশে আসেন সালাম। ঢাকার মিন্টু রোডে অবস্থিত তত্কালীন ‘ডাইরেক্টর অব ইন্ডাস্ট্রিজ’ অফিসের রেকর্ডকিপার পদে যোগ দেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই নতুন দেশ নিয়ে তাঁর আশা ও স্বপ্ন হতাশায় পরিণত হয়। তিনি বুঝতে পারেন শোষকের বদল হয়েছে মাত্র। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য স্পষ্ট করে দেয় শাসকগোষ্ঠীর স্বরূপ। পাকিস্তানের ৫৬ ভাগেরও বেশি মানুষ বাংলায় এবং মাত্র ৬ ভাগ মানুষ উর্দুতে কথা বললেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চাইলে পূর্ব পাকিস্তানে জ্বলে ওঠে ক্ষোভের আগুন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্ররা মিছিল বের করলে সালাম সেই মিছিলে যোগ দেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে রফিক, জব্বার, বরকতসহ অনেকে শহিদ হন। আহত হন সালামসহ আরও ১৭ জন। প্রায় দশ মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ৭ এপ্রিল, ১৯৫২ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২৭ বছর বয়সী এই তরুণ।

সালামের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। ১৯৫৬ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন সংগ্রামের পর আমরা স্বাধীন করেছি আমাদের এই দেশ। সালামের মতো বীর শহিদদের রক্তে লেখা এ ভাষার মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। এই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আমরা নিয়ে যাব ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে—এই হোক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার ...।

 

নবম শ্রেণি, ময়মনসিংহ জিলা স্কুল,ময়মনসিংহ