আল মাহমুদ আমাদের এবং পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার বড় কবিদের পাশে দৃঢ় পায়ে দাঁড়াবার মতো যথাযথ কবিতার দেশ বিপুল শ্রমিকতায়, বিবিধ বিরোধিতা, অপমান ও চড়াই-উতরাই পার হয়ে মৌলিক স্বরে নির্মাণ করেছেন। গলাখাকারি, উন্নাসিকতা ইত্যাদিকে অবহেলা করে নিজের মৌলিক ভূমি কর্ষণ করতেও
যোগ্যতা লাগে
এখনকার তো বটেই, আগামীদিনের কবিদের আল মাহমুদকে পড়তেই হবে। এবং কবিতার দীক্ষিত পাঠকেরা, যাঁরা জীবনচর্যার শর্ত এবং না-শর্তের বিষয়কে যথাশব্দের আধারে পড়তে, দেখতে চান বলে, কবির গঠিত পঙিক্তর সড়কে নিরন্তর পথিক, তাঁর কবিতার আশ্রমে নিজেকে আশ্রমিক করে একরকমের নির্বাণ অর্জন করবেন। কেন কবিদের পড়তে হবে? ভালো, উত্তম এবং খারাপ কবিতা কাকে বলে, এ-সবের তুলনামূলক বিচার-বিবেচনার জন্য অবশ্যপাঠ্য বড় কবিদের কবিতা। আমাদের ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। তিনি অন্য ভাষার কবি হলেও সেই ভাষার অন্যতম প্রধান কবি হতেন।
সারস্বত সমাজ জানে, কোনো কবি বা লেখক যদি নিজের ভাষার মাটিতে তাঁর কবিতা বা লেখাচর্চার মৌলিক শেকড় বপন করতে না পারেন, তা হলে তাঁর স্বভূমি কেন, দূরের মাটিতেও তাঁর শেকড় থেকে বৃদ্ধি পাওয়া গাছ কোনো ছায়া দিতে পারে না। সমকালীন খ্যাতি, যা বেশিরভাগ সময় পলতে পায় মনোরঞ্জনকারী লেখা এবং প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে বিশেষ ধরনের যোগাযোগ ও চক্ষুপোষকতায়, সময়ের পথ যত এগোতে থাকে, দেখা যায় খ্যাতিমানের খোঁজ কেউই করছে না।
আল মাহমুদ আমাদের এবং পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার বড় কবিদের পাশে দৃঢ় পায়ে দাঁড়াবার মতো যথাযথ কবিতার দেশ বিপুল শ্রমিকতায়, বিবিধ বিরোধিতা, অপমান ও চড়াই-উতরাই পার হয়ে মৌলিক স্বরে নির্মাণ করেছেন। গলাখাকারি, উন্নাসিকতা ইত্যাদিকে অবহেলা করে নিজের মৌলিক ভূমি কর্ষণ করতেও যোগ্যতা লাগে।
কবির আবার পরিণত বয়স কী? আল মাহমুদের শারীরিক বয়স (১১ জুলাই ১৯৩৬-১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) তিরাশি চলছিল। একজন মানুষ যখন কম বয়স থেকেই কবি হয়ে ওঠে, রাজনীতি, অর্থনীতি, বৈষম্য, প্রেম, হত্যা এবং প্রকৃতির ভালোমন্দকে, ওই মানুষটি অন্যভাবে দেখা ও বলা শুরু করে, তখন থেকেই সে পরিণত। যদিও পরিণতির মাত্রা মাপা কর্মবিষয়ের প্রেক্ষিতনির্ভর। আল মাহমুদের সব কবিতার বয়স বাড়তেই থাকবে এবং জীবনের ও স্বপ্ন দেখার সত্যে জারিত হয়ে সময়ের থাপ্পরে কিছু কবিতা লোলচর্মের আনুকূল্যে পড়ে বুড়ো হবে না। তাঁর কিছু কবিতা ক্লাসিক। ক্লাসিক সবসময়ের জন্য অবশ্যপাঠ্য। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের সব কবিতা ক্লাসিক হয় না। উত্তম কবিতা ধ্রুবপদ হয়ে থাকে।
কোন সৃষ্টিশীল মানুষকে নিয়ে বিতর্ক নেই? কবিদের নিয়ে বিতর্কের কাঁটাগাছ অনেক। আল মাহমুদের বেঁচে থাকবার বিবিধ যুদ্ধ এবং তাঁর ব্যক্তি-জীবনের সততা, আদর্শিক নৈতিকতার পাকদণ্ডি নিয়ে তর্ক কিছুদিন চলবে। তাঁর সমকালীন কবিবন্ধুরা (?), যাঁদের পারিবারিকসূত্রেই অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল সুদৃঢ়, ঢাকায় বসবাস, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র এবং অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দারিদ্র্য সঙ্গে নিয়ে এসে মুখে কিছু অন্ন জোগাবার জন্যে আল মাহমুদের ভুল বানান শুদ্ধ করবার কাজ করা। এই সামান্য কাজ কেন? বেঁচে থেকে কবিতা লিখতে হবে। ‘শপথ’-টা এমন : কবিতা লেখাই হবে সমসময়ের কবিদের সঙ্গে মৌলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ব্যাপরটা প্রায় এরকম : কলকাতার তুলনায় সবদিক থেকে অনেক পিছিয়ে পড়া বরিশাল নামের এক মফস্বল থেকে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা অতি সাধারণ একজন জীবনানন্দ দাশ গিয়ে পড়লেন আড্ডায় বেশিরভাগ কথা ইংরেজিতে বলা, স্যুটটাই পরা, কথায় কথায় বোদলেয়ার, মালার্মে, এলিয়ট বলা এবং অর্থসামর্থ্যে এগিয়ে থাকা কবিদের মধ্যে। আল মাহমুদকে কর্নার করবার জন্যে তাঁর আশপাশের উন্নাসিক কবিরা কী আচরণ করেছেন, তার বয়ান একদিন পরিষ্কার হবে। মানুষটার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল : খুব ভালো কবিতা লেখা। ‘সোনালী কাবিন’-এর উত্সর্গপত্র মনে রাখা দরকার :‘আমাদের এক কালের সখ্য ও সাম্প্রতিক কাব্য হিংসা অমর হোক’ কথাটির মধ্যে অনেক কথা ও সত্য নিহিত। বাক্যে ‘এক কালের’ এবং ‘কাব্য হিংসা’ শব্দগুলির গভীরতা ব্যাপক। তাঁর পঙিক্তগুলি কী বলছে? ‘আমাদের কলাকেন্দ্রে, আমাদের সর্ব কারুকাজে/অস্তিবাদী জিরাফেরা বাড়িয়েছে ব্যক্তিগত গলা।’ (সোনালী কাবিন, সনেট : ১১।) এবং ‘ধানের স্বপ্ন দু’চোখে আমার, এই নগণ্য/ দাবি তুলতেই কারা ব’লে ওঠে বন্য, বন্য।/ধান তোলবার অস্ত্র নিলাম বিপুল শব্দে/হঠাত্ তখুনি মনীষীরা বলে, এ-ও জঘন্য।’ (সোনালী কাবিন : নতুন অব্দে)। আমি নিশ্চিত, দু’এক দশক পরে তাঁর বাঁচার জন্যে কিছু পতন (ওই পতন হতো না, যদি তাঁকে বন্ধুরা সম্মানজনক ভাবে বেঁচে থাকবার জন্যে সহযোগিতা করতেন।) সম্পর্কে মধ্যবিত্ত মানসিকতার অলস বিতর্ক সুবিধাবাদীদের প্রলাপ বলে গণ্য হবে।
তাঁর কিছু কবিতায় আমাদের ধর্মে ও জীবনচর্চায় আচরিত বিভিন্ন বিষয়ের উল্লেখ আছে বলে তাঁকে অনেকে ‘মৌলবাদী’ বলেন। বালখিল্যরা প্রশ্ন তোলে, যে-কবি ‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন’ (সোনালী কাবিন, সনেট : ১০) বলেন তিনি কেন ধর্মে উচ্চারিত শব্দ বা বিষয় লিখবেন? তাঁরা বোঝেন না বা দেখেন না, আল মাহমুদ কবিতায় ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দেননি। বরং বলেছেন, আধ্যাত্মিকতার বোধ এবং মানুষের স্বপ্নের আকাঙ্ক্ষা ও পরাজয়ের কথা।
একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। তা হলো, কোনো মুসলমান কবি যখন তাঁর কবিতায় নিজধর্মের বিষয় বা শব্দ ব্যবহার করেন, তখন তাঁকে দ্রুত মৌলবাদী কবি বলা হয়, কিন্তু অন্য ধর্মের কোনো কবি যখন ইসলাম ধর্মের কোনো শব্দ বা বিষয়কে কবিতায় কবিতা করে তোলেন তখন ওই কবিকে প্রগতিশীল বলা হয়। বাংলাদেশের অনেক কবি যখন অন্য ধর্ম বা মিথোলজির উপমা, চিত্রকল্প ব্যবহার করেন তাঁকেও খুব আধুনিক ও প্রগতিশীল বলা হয়। ধর্ম-ভিত্তিক শব্দ বা বিষয় কীভাবে, কী লক্ষ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার গভীরের সন্ধান প্রয়োজন। সকলেই আধুনিক বা প্রগতিশীল নয়, গুটিকয়েক মানুষ ওই দুই ঘরানার পথিক মাত্র। সব বড় কবিই সবসময়ই আধুনিক। আল মাহমুদ কবিদের কবি।
