কবি আল মাহমুদের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ১৯৬৭ সালের কোনো একদিন। ডিআইটি রোডে অবস্থিত বিখ্যাত মাসিক সাহিত্যপত্র ‘সমকাল’ কার্যালয়ে আমি সম্পাদক কবি সিকানদার আবু জাফরের রুমে বসেছিলাম। কবি সিকানদার আবু জাফরকে আমি বলতাম জাফর ভাই।
‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশের আগে জাফর ভাই সমকালে আমার একটি কবিতা ছেপেছিলেন।
সমকাল কার্যালয়ে তখন দেশের সেরা কবি-সাহিত্যিকরা আসতেন। সকাল দশটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত সেখানে আড্ডা হতো। আমি ছিলাম ঐ আড্ডার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য।
তখন ভালো কবিতা না লিখলেও, পরে একসময় আমি ভালো কবিতা লিখতে পারব—এরকম একটা ধারণা জাফর ভাইয়ের কেন হয়েছিল, তা আজও আমার অজানাই রয়ে গেল।
আমি যে ‘হুলিয়া’ কবিতা রচনার দোরগোড়ায় রয়েছি, এটি জাফর ভাই মনে হয় আঁচ করতে পেরেছিলেন। আমি যে হুলিয়া মাথায় নিয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম—জাফর ভাই তা জানতেন। তখনকার দৈনিক পাকিস্তানের সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীব বা উন্মত্ত প্রজন্মের প্রিয় সাহিত্যপত্র ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আমাকে সেরকম কোনো ধারণা দিতে পারেননি।
জাফর ভাইকে বলেছিলাম, আমি কবি আল মাহমুদের সঙ্গে পরিচিত হতে আগ্রহী। তিনি কি সমকালে আসেন?
জাফর ভাই বলেলেন, আসবে না মানে, আসতেই হবে।
জাফর ভাইয়ের কথার সত্যতা প্রমাণিত হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। এক পড়ন্ত দুপুরের দিকে কবি আল মাহমুদ সশরীরে হাজির হলেন সমকাল কার্যালয়ে।
পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরা, গলায় ময়লা মাফলার জড়ানো, নিঃশব্দ চরণে সমকাল-এ প্রবেশকারী ঐ আগন্তুককে দেখে আমি ভাবতেই পারিনি, ইনিই কবি আল মাহমুদ।
যদিও সমকাল কবিতা সংখ্যায় তাঁর ছবি আমি দেখেছিলাম।
আগন্তুককে স্বাগত জানিয়ে জাফর ভাই বললেন, এই যে আল মাহমুদ, তোমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য এই তরুণ কবি অপেক্ষা করছে।
আল মাহমুদ? আমি চমকে উঠে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। কবি আল মাহমুদ হাত বাড়িয়ে আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন। আমি মুগ্ধ হলাম তাঁর সারল্যে।
তাঁকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে ভাবলাম, কোট প্যান্ট পরা আধুনিক কবিদের এই দাপটের যুগেও আল মাহমুদের মতো কবি হওয়া তবে এখনো সম্ভব!
আল মাহমুদ তখন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় অতি সামান্য বেতনে চাকরি করেন। তিনি উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত কেউ নন—এটা জেনে আমি নিজের ব্যাপারে কিছুটা আশ্বস্ত বোধ করি।
আমার প্রিয় কবির শিক্ষাভাগ্য আমার শিক্ষা-দুর্ভাগ্যের বেদনাকে অনেকটাই লাঘব করে দিলো।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ আমি পড়েছি এবং ঐ গ্রন্থের কিছু কবিতা আমার মুখস্থ আছে জেনে তিনি খুব খুশি হয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
২.
আমি আল মাহমুদের লিরিক কবিতার ভক্ত ছিলাম। আমি তাস খেলার পাগল। পরে ভিন্ন খেলায় চলে গেলেও শুরুতে ব্রে খেলাটা আমার খুব প্রিয় ছিল।
আমি আল মাহমুদের ‘ব্রে’ কবিতাটি পড়ে মুগ হই। বলি, আপনার ব্রে কবিতাটি আমার মুখস্থ আছে।
‘যখন জীবনে শুধু লাল হরতন একে একে
জমা হলো, বলো এ কী অসম্ভব বোঝা!
মুক্ত হয়ে হাঁটবার বন্ধ হলো সব পথ খোঁজা—
এদিকে তুমিও এলে ইসকার বিবির মতোন।’
কবিতাটি তিনি তাঁর স্ত্রী নাদিরাকে উত্সর্গ করেছেন।
যারা ব্রে খেলা জানেন, তারা এই কবিতার রস যতটা গ্রহণ করতে পারবেন, যারা জানেন না, তারা ততটা পারবেন না। তাস খেলার এমন নৈপুণ্যভাস্বর কাব্যরূপ বাংলা কবিতায় আর দ্বিতীয়টি নেই। নবাগতা স্ত্রীকে বিড়ম্বিত কবিজীবনে স্বাগত জানাবার এর চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল আর কী হতে পারে?
আমার মুখে তাঁর লেখা ‘ব্রে’ কবিতাটির আবৃত্তি শুনে তিনি মুগ্ধ হলেন।
আমি বললাম, নাদিরা ভাবীকে আমার সালাম জানাবেন।
আল মাহমুদ খুশি মুখে হাসতে হাসতে বললেন, আপনি একবার আসুন আমার বাসায়, নাদিরা তাতে বেশি খুশি হবে।
কিছুদিনের মধ্যেই আমি কবি আল মাহমুদের বাসায় গিয়েছিলাম।
নাদিরা ভাবী সেদিন আমাকে ভাত না খাইয়ে ফিরতে দেননি।
ব্রে কবিতাটি নিয়ে আলাপ হয়েছিল। ভাবী জানতেনও না তাঁর স্বামী তাঁকে নিয়ে এরকম একটি লজ্জাজনক কবিতা লিখেই ক্ষান্ত হননি, ঐ কবিতাটি আবার তাঁর নামে উত্সর্গও করেছেন।
ভাবীর আগ্রহে ব্রে কবিতাটি আমি আবারও পড়লাম।
ভাবী খুশিও হলেন—আবার কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বললেনও—এরকম কবিতা আপনার ভাই যদি আর কখনও লেখেন, তো আপনার ভাইয়ের কিন্তু খবর আছে।
ফেরার সময় মাহমুদ ভাই বললেন, নাদিরা দারুণ মেয়ে না?
আমি বললাম, হুম, নিঃসন্দেহে। আমার খুব ভালো লেগেছে ভাবীকে।
৩
আমার কাছে, কবি আল মাহমুদ এবং নাদিরা ভাবী আজও সেই দৃশ্যে স্থির হয়ে আছেন।
