জুয়েল মাজহার
(কবি আল মাহমুদ স্মরণে)
ধূলিধূসর অচেনা এক উপত্যকার ঢালুতে আমরা ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জেগে উঠে দেখি, সঙ্গীরা আমাকে ফণীমনসার ক্যানোপির নিচে ফেলে রেখে গেছে। বিধবাদের রজঃশোষক ত্যানার মতো নেতিয়ে পড়ে আছি আমি; ভ্রমণক্লান্ত ক্ষুত্কাতর একা আর নিঃসহায়।
কোন ভাষায় যে কথা বলতাম এখন আর মনে নেই। মাথার উপর মৌমাছির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে নানান অচেনা ভাষার অবোধগম্য শব্দেরা। চারপাশে ষাঁড়ের শিশ্নের মতো লাল লাল উইঢিবি আর মরীচিকার ঢেউখেলানো কুহক। জলবিভ্রম নামের বিভীষিকা খেলছে আমাকে নিয়ে। আমার কাতর জিভকে তা করে তুলেছে আরও তৃষাতুর।
গর্ত থেকে বেরিয়ে এসে তিনটে আবলুশরঙ ধাড়ি ইঁদুর পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে; তারা আমাকে পরখ করছে অসীম কৌতুকে। তাদের অবজ্ঞাময় খরদৃষ্টির চাবুক প্রহার করছে আমাকে। আর এক ভয়াল খড়েগর নিচে রোরুদ্যমান আমার পিগমি-দেহ। তাতে একে একে গজিয়ে উঠছে উপদংশের কষগড়ানো বীভত্স লাল ক্ষত।
এখানে, এই ক্যাকটাস-কলোনিজুড়ে অজস্র রঙের মুহুর্মুহু বিস্ফোরণ। ঈষাণে ফণীমনসার উদ্যত বিভীষিকা। নৈঋতে কর্কট ব্যাধি আর নৈঃশব্দ্যের লাল তর্জনী। এর নিচে চুপসে যাওয়া স্তনের মতো বয়ে চলেছে আবছা এক ক্ষীণতোয়া নদী।
আকাশের গোপন কৌটা থেকে আবির চুরি করে অস্তাচল-কিনারে বসে একমনে নিজেকে রাঙাচ্ছে এক একচক্ষু দানব; একসময় সে তার প্রকাণ্ড লাল চোখটি টুপ করে ফেলে দেবে পশ্চিমের পার্পল মেঘের নিচে; কাল আবার একে সে কুড়িয়ে নেবে উদয়-প্রহরে।
তার বিষণ্ন অক্ষিগোলকে বাক্য ও মনের অতীত এক সন্ধ্যা নামলো ধীরে; এর ভেতরের নৈঃশব্দ্য যেন কুণ্ডলী পাকানো র্যাটল স্নেক। এই ভাঁজময়, এই বল্মীকূটময় বক্র উপত্যকার নিচে অজগরের মতো নিঃশব্দে নড়ে উঠছে এক আলকাতরার নদী। যার নাম রাত্রি।
এসবের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে ভুলে গেছি সঙ্গীদের মুখ। কানে কেবল পতঙ্গের অস্ফুট পাখার শব্দ; খদ্যোতের নেভা আর জ্বলা এফোঁড়-ওফোঁড় করে চলেছে রাত্রিকে। উপরে নিকষ কালো গালিচাটাও যেন চলে গেছে এদের দখলে; আদ্যন্ত আলকাতরা-মলিন আর ফসফরাস-ঝলকিত, আদি আর অন্তহীন, অগ্রপশ্চাত্হীন সেই অনন্ত গালিচা।
আর কিছু নয়; কেবলই মনে পড়ছে তোমার হারিয়ে ফেলা মুখের ডৌল আর টোলপড়া গালে মদির হাসি। তাতে ফলে আছে তিলের সৌরভ; স্বেদকণা জমতে জমতে গড়িয়ে চলছে এক ক্ষীণ ধারা... চিবুক থেকে গ্রীবা, গ্রীবা থেকে ক্রমশ স্তনের উপত্যকার দিকে ধাবিত সেই ধারা। দু’পাশে ঈষত্-আনত লাবণ্যের দুটি মোহন চূড়া; চূড়াশীর্ষে কেউ সযত্নে বসিয়ে দিয়েছে দুটি রসেভরা সুমিষ্ট জামফল। যা অতিশয় স্বাদু আর আমন্ত্রণময়; আর তা ভবিষ্যকালের ইশারামণ্ডিত; আর তা কামনামদির। কিন্তু সে-দুটি বাসনারক্তিম, প্ররোচনাময়, সুপক্ক জামফল চিরকালই সাধারণের নাগালের বাইরে সুরক্ষিত;
যে চায় সে পায় না; যে চায় না, সে শুধু পায়!
দ্যাখো, তোমার স্মরণে আমার লোমকূপে জেগে উঠছে গুজপিম্প। কী যে হলো আমার! কোনো চেনা ভাষার শব্দ উচ্চারণ করতে এখন অপারগ আমি। এখন আমাকে ঘিরে ধরেছে ভাষাহীনতার নৈকষ্যকুলীন অরব অন্ধকার। কিন্তু ঈষত্ ঝুঁকে থাকা এ-দুটি তসবি-দানায় চুম্বন করার পর আমি ঠিকই উচ্চারণ করতে পারছি তোমার নাম।
কেবল তোমার নাম! কেবল তোমার নাম!! কেবল তোমার নাম!!!
যতোবার উচ্চারণ করছি, ততোবার মাটি থেকে পাক খেতে খেতে উিক্ষপ্ত হচ্ছে লাল ঘূর্ণি। তোমার নামে স্যালুটের ভঙ্গিতে স্থির হচ্ছে নেত্রকোনা আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সবক’টি গোপাটঘেঁষা জঙ্গলে নৃত্যরত দইগলের লেজ। দোয়েলকে আমি আবার ডাকতে শুরু করেছি ‘দইগল’!
মগরা ও ধনুগাঙের ওপর থমকে থাকা মেঘের কুচি থেকে তোমার জন্যে ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য অদৃশ্য পাপড়ির লাবণ্যসঙ্কাশ।
আল মাহমুদ,
আমাদের বিস্মৃতির ধুলা সরিয়ে মৃত্যু নামের কালসর্পের ফণার উপরে একদিন উড়ে এসে বসবে এক অমর প্রজাপতি। যার অপর নাম প্রেম।
এভাবেই উপদংশের ক্ষত থেকে প্রতি ভোরে জন্ম নেবে শতশত আশ্চর্য গোলাপ!
