নদী খননের নামে ফসলি জমি কাটার অভিযোগ

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:৩০

সিংগাইরে ধলেশ্বরী নদী খননের নামে ফসলি জমি কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আবার ফসলি জমির ওপর দিয়েই চলছে বালুর ট্রাক। নদীর মাঝখান ভরাট করে দুই পাড়েই ট্রাক চলাচলের জন্য করা হয়েছে রাস্তা। জমিতেই করা হয়েছে বালুর পাহাড়। জমি কেটে নেওয়ার প্রতিবাদে এর আগে কৃষক সমিতি জেলা ও উপজেলায় মানববন্ধন করে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে প্রশাসনের কাছে।

কৃষকরা বলেন, নদীর গতিপথ ঠিক রাখতে তলদেশ খনন না করে এবং নদীর দুই পাড়ে রাস্তা না করে খনন করা হচ্ছে নদীর পাড় ও তাদের জমি। ফলে এক সময়ের উত্তাল ধলেশ্বরী এখন দখল ও দূষণের কবলে। খননের উদ্দেশ্য ছিল নদীর প্রস্থ ও গভীরতা বাড়ানোর মাধ্যমে নাব্যতা ফেরানো। যাতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক হয়। সেচকার্য এবং উন্মুক্ত জলরাশিতে মাছ শিকার করা যায়। এসব কিছুই হচ্ছে না। নদী খননে সরকারে যে উদ্দেশ্য তা ভেস্তে গেছে। লাভবান হচ্ছে ঠিকাদার আর সরকারের সংশ্লিষ্ট কতৃ‌র্পক্ষের অসাধু কর্মকর্তারা। বালু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকাভিত্তিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। রেকর্ডকৃত জমির কাগজপত্র দেখিয়েও জমি রক্ষা করা যাচ্ছে না। চলছে মাটি উত্তোলন। অসহায় হয়ে পড়ছে কৃষক। ইসলামনগর ব্রিজের দুইপাশ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ রুবাইয়াত জামান বলেন, কমপক্ষে ১০০ গজ দূর থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন না করলে ব্রিজের পিলারে যে কোনো সময় ফাটল ধরতে পারে। বিমা কর্মকর্তা চর জামালপুরের সামছুল ইসলাম বলেন, সরকারি জমিতে বালু না রেখে তা কৃষকের জমিতে রাখা হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত ছোট গাড়িতে মাটি বহনের কথা থাকলেও এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বড় বড় ড্রাম ট্রাক। ফলে কাঁচা-পাকা রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। ভেঙে যাচ্ছে মজলিশপুর ও চর জামালপুরের ফসলি জমি। উপড়ে পড়েছে গাছপালা। নদী খননতো হচ্ছে না, হচ্ছে বালু ব্যবসার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া। অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ড নীরব ভূমিকা পালন করছে।

আওয়ামী লীগ নেতা প্রকৌশলী তফসের আলী জানান, ‘চর গোলড়াতে পার্শ্ববর্তী জমি কেটে নেওয়ায় এখন আমার জমি হুমকির মুখে। এরা দলের লোক কার কাছে নালিশ করব।’ বিনোদপুরের বাসিন্দা জালাল উদ্দিন, নুরু পুলিশ, আলক মেম্বার ও নুর উদ্দিন বলেন, জমি কেটে নিলেও তারা বাধা দিতেও সাহস পাচ্ছেন না। সোহরাব হোসেন বলেন, সিএস পর্চা অনুযায়ী নদীর প্রস্থ ৬০ ফুট। জলপ্রবাহের উপরিভাগ হতে ১২ ফুট গভীরতা করে নদী খননের নিয়ম। নদীর পুরাতন ধারা সিএস পর্চা যেভাবে প্রদর্শিত হয়েছে সেই ধারা অবলম্বন না করে এবং বিধিমালা না মেনে ইচ্ছে মতো খনন হচ্ছে। গোলড়ার এনামুল হক বলেন, অনবরত বালু ভর্তি ড্রাম ট্রাক দিনের বেলায় যাতায়াত করায় ধুলা বালুতে হাঁটাচলাতো দূরের কথা, ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। পৌর বাজার ব্যবসায়ীদেরও একই বক্তব্য। ইউনিয়ন কৃষকলীগের সভাপতি লিয়াকত আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘দল থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দলের দোহাই দিয়ে যা করা হচ্ছে তা মানতে পারছি না।’ ইউপি সদস্য মীর রবিউল ও মো. শাহাজাহান জানান, একই স্থানে ড্রেজার দিয়ে অতিরিক্ত গভীর করে বালু উত্তোলনের ফলে নদী পাড়ের ৪০ থেকে ৫০টি বাড়িঘর বর্ষা কিংবা বড় ধরনের বৃষ্টি এলেই ভেঙে পড়বে।

চর জামালপুরের কৃষক মিলন খন্দকার বলেন, নদীর পাড়ে মাটি কেটে নেওয়ার ফলে তার জমির ফসল বিনষ্ট হয়ে গেছে। নয়াবাড়ির আব্দুস সামাদ ও আব্দুর রহিম বলেন, নদীর উত্তোলিত বালু স্তূপ করে রাখায় তাদের ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়ে গেছে। বালু ব্যবসায়ীরা পানি উন্নয়নের লাল নিশানের খঁুটি সরিয়ে তাদের সীমানায় রেখেছে। চর জামালপুরের হযরত আলী জানান, নেতারা কারোর বাধা মানছে না। আমির হক, নুরু আলমসহ আরো কয়েক জন জানান, তারা ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে ১১ পাখি জমির মাটি কটে নিয়েছে। অথচ এই জমির ওপর দিয়ে রাস্তা বানানো হয়েছে বালুর ট্রাক চলাচলের জন্য। ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। গিয়াস উদ্দিন জানান, এবারও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলে তার জমির সব ভুট্টাই কেটে নেওয়া। বাধা দিলে বলেন, সরকার অনুমতি দিয়েছে। এদিকে খননের বিষয়ে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন বলেন, সদর ও সিংগাইরের ক্ষেত্রে নদী খননের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে আগামী জুন পর্যন্ত। এ ছাড়া ৪৫ কিলোমিটার থেকে আরো সাড়ে ১০ কিলোমিটার বাড়ানো হয়েছে। মোটামুটি ঠিকমতোই কাজ হচ্ছে। খনন করতে গেলে জমি ভেঙে পড়তেই পারে। নদীর মাঝখানে ফসলি জমি কাটা হচ্ছে তা নয়, যেখানে কাটার দরকার সেখানেই কাটা হচ্ছে।

তারই অধীনস্থ উপসহকারী প্রকৌশলী সালামত হোসেন বলেন, নতুন করে আর খননের ব্যাপ্তি বাড়ানো হয়নি। ৪৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার পর্যন্তই রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদও চলতি মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত। এ ছাড়া ২০১৯ থেকে শুরু করে কাজও প্রায় শেষ। পাঁচটি প্যাকেজের ৫০ কোটি টাকার ওপরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এ প্রকল্পের জন্য। নদীর জায়গাতেই খনন করা হচ্ছে। যারা অভিযোগ করেন তারা নদীর মাঝখানেও ধান চাষ করেন। 

ইত্তেফাক/কেকে