বুধবার, ১৮ মে ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অভিভূতকর অপেক্ষা

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২২, ১৯:৪০

বাইরে বৃষ্টি ঝুমঝুম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল কি? নাকি সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত? বাতি জ্বালিয়ে দেওয়াল ঘড়িটা দেখে নিলেই হয়। ইচ্ছে হচ্ছে না। সামনে টেবিলের উপরের খোলা বই নিয়ে অন্ধকার রুমে বসে আছি। পড়া হচ্ছে না অনেকক্ষণ আগে থেকেই। সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা অথচ কিছুই পড়তে ইচ্ছা করে না। প্রায়শই এরকম হয়। এটা সেটা খেতে আর বউকে নিয়ে ঘুরতে যেতেই পছন্দ করি। আসলে সমস্যা সেখানেই। ইদানীং ওকে বেশ মিস করছি। সেই শীতে আমাদের দেখা। তারপর কত পূর্ণিমা আর সুনীলের অমাবস্যা পালাবদল করে গেছে। রোদ, জ্যাম মাথায় নিয়ে কলেজ যাওয়া-আসা। আর ঢাকার মশা অবশ্য বৈশাখ আষাঢ় সব মাসকেই এক করে টের পাইয়ে ছাড়িয়েছে। তারপর এই আকাশভাঙা শ্রাবণ মেঘের দিন। মনে পড়ে ও মোবাইলে এক মিষ্টি মধুর রাতে আমাকে লিখেছিল—‘জগৎ প্লাবিয়া গেল আজি হায়/এমন দিনে তুমি না জানি কোথায়?’

কার যেন লেখাটা এই মুহূর্তে ভাবতে ইচ্ছে করছে না। আমার যে কেবল ওকেই দরকার। কলেজে অনার্স পড়তেই আমাদের বিয়ে। সাক্ষী কেবল মাঘের সন্ন্যাসী অর্থাৎ শীতকাল। আমি তো বুঝতেই পারিনি যে কী থেকে কী হলো। অথচ তার ভাষায় আমাদের বিয়ে নাকি রবীন্দ্রনাথের অপু-হৈমন্তীর বিয়ের মতো। কিন্তু তাই বলে আমি তার প্রতি অপুর মতো উদাসীন নই। তার মতে ‘বিবাহ বাড়িতে চারিদিকে তুমুল হৈ-হট্টগোল, এরই মাঝখানে বরের হাতখানি আমার হাতে পড়িল।’ এরপর আমি রবীন্দ্রনাথের উক্তির সঙ্গে মিলিয়ে ফিসফিস করে বলি—‘আমি পাইলাম ইহাকে পাইলাম। এও কী সম্ভব? এ যে মানবী অর্ধেক কেবল বিদ্যমান। বাকিটুকু কল্পনা মাত্র।’ পড়ার টেবিলে বসে এসব ভাবতে ও-ই আমাকে বারণ করে। কিন্তু থাকতে পারি না। তাকে নিয়ে আমার ভাবনা চিঠি হয়, সেই চিঠি কাগজের প্লেন হয়ে আমাকে নিয়ে চলে যায় তার কাছে। আমার ভালোবাসার কাছে। সে হয়তো অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। ‘এই যে গিন্নি, আপনি কিন্তু আমার সম্পত্তি নন, সম্পদ। মনে আছে তো? মেয়ে মানুষ হয়ে এত কীসের চাকরি? কদিন বাদে তো আমিই চাকরি করব।’ সে হয়তো কপট-গম্ভীরভাবে বলবে, ‘আপনারে চেনা চেনা মনে হয়, ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। সেদিন পার্লারের সামনে আপনারে ঘুরঘুর করতে দেখেছি।’ আমি চোখ পাকাতেই সে হেসে ফেলবে। আমাদের খুনসুটি কখনো শেষ হবার নয়।

এদিকে রোজা শুরু হয়ে গেল। তারপর নিশ্চয় ঈদের জন্য দিন গুনতি। আমার চোখে অপেক্ষার বাষ্প জমে। বছর দুই আগের ঈদের কথা মনে পড়ে। ওর চাকরির সুবাদে দুজন টেকনাফে। এক রাতে দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। রাতে সাগরের শোঁ-শোঁ শব্দ। আমরা দুজন হাত ধরে হাঁটছি। ঢেউয়ের ফেনারাশি চাঁদের আলোয় চকচক করছে। প্রার্থনা জানালাম স্রষ্টার কাছে—‘হে সর্বশক্তিমান, আমাদের জীবনকে পবিত্র ভালোবাসায় প্লাবিত করো।’ আহা! সমুদ্রের কাছে দীর্ঘ সময় কাটানোর সঙ্গে আর কিছুর তুলনা হয় না। টেকনাফ হতে আরেক সন্ধ্যায় রওনা হয়েছিলাম শাহপরীর দ্বীপে। নামে দ্বীপ হলেও জায়গাটা তিনদিক হতে জলে বেষ্টিত। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন ভরা পূর্ণিমা। দিগন্ত ছাড়িয়ে আকাশে চাঁদের রুপালি জ্যোৎন্সা। টেকনাফ হতে গ্রামের রাস্তা দিয়ে কিছুদূর যেতেই এক আলোকময় অপার্থিব নিস্তব্ধতা আমাদের গ্রাস করল। হেডলাইট অফ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে হেডলাইট ছাড়া এভাবেই চাঁদের আলোয় গাড়ি চালিয়ে এলাম। দুজনে বের হয়ে আসতেই রাস্তার দুপাশে সাদা-সাদা স্তূপাকার লবণের ঢিবি, সামনেই মোহনা, অভিভূত হয়েছিলাম কীভাবে চাঁদ গলে গলে পড়ছিল বাংলার এই দূরতম কোণে।

নাহ, খুব বেশি মনে পড়ছে তাকে। এদিকে হয়তো ইফতারের সময় হয়ে এলো। হয়, হোক! আমি আরো কিছুক্ষণ ওকে নিয়েই ভাবব। আচ্ছা, এবার সে আমার কাছে আসবে তো? ঈদের অনেক বাকি, সব ছেড়ে ক’টা দিন আগেই আসুক না চলে। বাইরে বৃষ্টি কমে এসেছে। আমি বিড়বিড় করে তার নামে কবিতা আওড়াই। একবার দুইবার, বারবার। ভালোবাসা সব পারে। আমার মন বলছে, সে আজই চলে আসবে, তারপর পেছন থেকে চোখ চেপে ধরে বলবে ‘সারপ্রাইজ!’

সুনীলের কবিতা তার ভীষণ পছন্দ। আমিও তার দেখাদেখি পছন্দ করা শুরু করেছি। চোখ জ্বালা করে ওঠে আমার। দরজায় কার যেন শব্দ শুনতে পাচ্ছি। বৃষ্টি মনে হয় থেমে গেছে পুরোপুরি। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ দ্রুত আর জোরালো হচ্ছে। আমি চেয়ার ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাই আগ্রহ সহকারে। এ কী?

‘ঘরে পথে লোকালয়ে স্রোতে জনস্রোতে আমাকে কী
একাই খুঁজেছ তুমি? আমি বুঝি তোমাকে খুঁজিনি?’ 

(স্পর্শ—জয় গোস্বামী)

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

কবিতা

ওভার ট্রাম্পড

আঁধারের হাত ধরে

হুমায়ুন আজাদের সমাজদর্শন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

আজ কবিগুরুর জন্মদিন

অসমাপ্ত প্রণয় 

সম্রাট আকবর তানপুরা কাঁধে নিয়ে চললেন তানসেনের গুরুগৃহে 

অমলার যুদ্ধ