মো. মাসুদুর রহমান
খাদ্যে ভেজাল একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। মানবতাবিরোধী এ অপরাধের বিরুদ্ধে ইসলামে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার অর্থ হলো সত্যের সঙ্গে মিথ্যার সংমিশ্রণ। এবং তা ইসলামে নিষিদ্ধ কাজ। এ ব্যাপারে আল্লাহপাক বলেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে গুলিয়ে দিও না এবং তোমরা জেনে-শুনে সত্যকে গোপন করো না।’ (সূরা বাকারা : ৪২)।
খাদ্যে বা যে কোনো পণ্যে ভেজাল মেশানোর প্রক্রিয়ায় সব কথা ও কর্মকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেমন- অনেক সময় মিথ্যা কথা বলে বা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভেজাল পণ্য শতভাগ খাঁটি বলে বিক্রি করা হয়, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহপাক বলেন, ‘মিথ্যার আশ্রয় নেয় তারাই যারা আল্লাহর আয়াতে বিশ্বাস করে না।’ (সূরা নাহল :১০৫)।
অনেকে আবার শুধু মিথ্যা বলেই থেমে থাকেন না বরং কসম করে মিথ্যা বলার মাধ্যমে ক্রেতার বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করত বিক্রি করে। অথচ নবী করিম (স) তা করতে নিষেধ করেছেন। বিশ্বনবী বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কোনো কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না, তাদের পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন হলো যে তার ব্যবসায়িক পণ্য মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রি করে।’ (মুসলিম)।
এই ভেজাল মেশানোর বা বিক্রির প্রক্রিয়ায় মিথ্যা বলা, সত্য গোপন করা বা মিথ্যা কসম করার সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো নিষিদ্ধ অপরাধের গোনাহ হয়। যেমন—
১. প্রতারণা করার গুনাহ হয়। আর ইসলামে প্রতারণা করা নিষিদ্ধ। অথচ খাদ্যদ্রব্য বা যে কোনো পণ্যের ত্রুটি গোপন করা স্পষ্ট প্রতারণা হওয়া সত্ত্বেও অনেকে তা করছে। হাদিসে এসেছে রাসুলুল্লাহ (স) প্রতারণামূলক বেচাকেনাকে নিষিদ্ধ করেছেন। (মুসনাদে আবু হানিফা)। নবীজি আরও বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে (ব্যবসার ক্ষেত্রে) সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, তিরমিজি)। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স) বলেছেন, ‘জেনেশুনে কোনো ত্রুটিযুক্ত পণ্য বিক্রি করা কারও জন্য বৈধ নয়, যতক্ষণ না ক্রেতাকে ওই ত্রুটি সম্পর্কে অবহিত করা হয়।’ (বোখারি)।
২. অন্যের অধিকার হরণের গুনাহ হয়। যেমন নবীজি (স) বলেছেন, ‘যে লোক নিজের শপথ দ্বারা কোনো মুসলমানকে বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত এবং জান্নাত হারাম করে দেন।’ এক ব্যক্তি আরজ করল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! তা যদি খুবই সামান্য বিষয় হয়? তিনি বলেন, ‘যদি একটা গাছের কাটা ডালও হয় তবুও।’ (মুসলিম, নাসায়ি)।
৩. আত্মসাত্ করার গুনাহ হয়। খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারীরা ভেজাল পণ্য বিশুদ্ধ পণ্যের সমমূল্যে বিক্রি করে কিছু মূল্য অন্যায়ভাবে হাতিয়ে নেয় বা আত্মসাত্ করে। এটিও নিষিদ্ধ। নবীজি (স) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে নিঃস্ব তো সে ব্যক্তি, যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাতের (নেকি) নিয়ে হাজির হবে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে সে এ অবস্থায় আসবে যে, সে কাউকে গালি দিয়েছে। কারও প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে, কারও মাল (অবৈধভাবে) ভক্ষণ করেছে। কারও রক্তপাত করেছে এবং কাউকে মেরেছে। অতঃপর অত্যাচারিত ব্যক্তিকে তার নেকি দিয়ে দেওয়া হবে, পরিশেষে যদি তার নেকিগুলো অন্যদের দাবি পূরণ করার আগেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাদের পাপরাশি নিয়ে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম)।
৪. মানুষের ক্ষতি করার গুনাহ হয়। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি (শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক) করা হয়। যা ইসলামে হারাম। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, ‘নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতি করা যাবে না’ (ইবনে মাজাহ)।
৫. মানুষকে কষ্ট দেওয়ার গুনাহ হয়। খাদ্যে ভেজাল দানকারীরা মানুষকে কষ্টদানকারীও বটে। কারণ ভেজাল খাবার খেয়ে মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় অতঃপর অসুস্থ হয়ে কষ্ট পায়। আর মানুষকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া হারাম। আল্লাহপাক বলেন, ‘যারা বিনা অপরাধে মোমিন পুরুষ ও মোমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সূরা আহজাব : ৫৮)।
৬. মানব হত্যা বা গণহত্যার গুনাহ হয়। সর্বোপরি ভেজাল পণ্য বা নির্দিষ্ট ভেজাল অংশ বিক্রির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ হারাম এবং তা ভোগ করলে দোয়া, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতসহ কোনো ইবাদতই আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। বিশ্বনবী (স) বলেছেন, ‘হারাম উপার্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলে তার ইবাদত কবুল হয় না।’ (বায়হাকি)।
l লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
