রেজাউল হক কৌশিক
গত বছরের জুলাই থেকে ব্যাংক খাতে ঋণে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমেছে বলে দাবি করছেন ব্যাংকাররা। যদিও সঠিকভাবে তা সব ব্যাংক মানছে কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ, ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে যে তথ্য পাঠায় সে তথ্যের সঠিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। এমন অবস্থার মধ্যেও খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেই দেখা গিয়েছে গত জুলাইয়ের তুলনায় অনেক ব্যাংক ঋণে সুদ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে গত জুলাইয়ের তুলনায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) জানুয়ারিতে বেড়ে গিয়েছে।
জানা গেছে, গত বছরের শুরুতে ঋণের সুদহার বাড়ায় ব্যাংকগুলো। পরে ধারাবাহিকভাবে ঋণের সুদহার বাড়তে থাকে। ফলে ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার সংকট দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকের পরিচালকদের সংগঠন বিএবি’র পক্ষ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের কাছ থেকে ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন সুবিধাও পাইয়ে দিতে সক্ষম হয় বিএবি। বিএবির পক্ষ থেকে ঋণে সুদের হার ৯ শতাংশ এবং আমানতের ক্ষেত্রে সুদের হার ৬ শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছর জুলাইয়ের ঋণে যে সুদ ছিল জানুয়ারিতে তার চেয়ে ৯টি ব্যাংকের সুদ বেড়ে গেছে। আর আমানতে সুদহারের ক্ষেত্রেও নির্দেশনা মানছে না অনেক ব্যাংক। গত জুলাইয়ের চেয়ে গেল জানুয়ারিতে ৮টি ব্যাংক আমানতে সুদহার বাড়িয়েছে। যার মধ্যে সাতটি ব্যাংকের আমানতে সুদের হার ৬ শতাংশের বেশি ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত জুলাইয়ে ন্যাশনাল ব্যাংক ৯ দশমিক ০৩ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। জানুয়ারিতে এসে তা ৯ দশমিক ১২ শতাংশ হয়ে গেছে। এনআরবি ব্যাংকের সুদহার ১১ দশমিক ৯৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ০৯ শতাংশ। প্রিমিয়ার ব্যাংকের সুদ ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ হয়েছে। ডাচ-বাংলার সুদ ১০ দশমিক ২৩ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ২৬ শতাংশ হয়েছে। সীমান্ত ব্যাংকের সুদ ১০ দশমিক ০১ শতাংশ থেকে হয়েছে ১০ দশমিক ০৬ শতাংশ। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সুদহার জুলাইয়ে ছিল ৯ দশমিক ৩২। জানুয়ারিতে তা হয়েছে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে থাকলেও জানুয়ারিতে তা বেড়েছে। সাত দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে সাত দশমিক ৫৬ শতাংশ হয়েছে এ ব্যাংকের সুদহার। আইএফআইসি ব্যাংকের সুদ ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ। এদিকে এক্সিম ব্যাংকের সুদের হার জুলাইয়ে ছিল ১০ দশমিক ৩৩ শতাংশ। জানুয়ারিতে ব্যাংকটির বিনিয়োগে সুদহার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
অন্যদিকে গতবছর বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছিল স্প্রেড চার শতাংশীয় পয়েন্টের মধ্যে রাখতে। সে নির্দেশনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর স্প্রেড কমার পরিবর্তে উল্টো গত জুলাইয়ের চেয়ে জানুয়ারিতে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, গত জুলাই শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ছিল চার দশমিক ৩৩ শতাংশীয় পয়েন্টে। জানুয়ারি শেষে এসব ব্যাংকের স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। জুলাইয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে গড়ে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ সুদ দিয়েছে। জানুয়ারিতে তা বেড়ে ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ সুদ দিয়েছে। অন্যদিকে গত জুলাইয়ে ঋণের বিপরীতে আদায় করেছিল ১০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আর জানুয়ারি শেষে হিসাবে দেখা গেছে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর গড়ে ঋণের বিপরীতে আদায় করেছে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ।
৪০টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ২৫টি ব্যাংক নির্দেশিত হারের (চার শতাংশীয় পয়েন্ট) চেয়ে স্প্রেড বেশি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি স্প্রেড রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের। এ ব্যাংকের স্প্রেড ৮ দশমিক ০১ শতাংশীয় পয়েন্ট। জুলাইয়ের তুলনায় জানুয়ারিতে স্প্রেড বেড়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, আল আরাফা ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলোর যাতে চার শতাংশীয় পয়েন্টের মধ্যে স্প্রেড নিয়ে আসে সেজন্য বলছি। অনেক ব্যাংকই নির্দেশিত হারে মধ্যেই স্প্রেড নামিয়ে নিয়ে এসেছেন। বাকিরাও চেষ্টা করছেন।
সাধারণত, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয়। একইভাবে আমানতের সুদের হারও নির্ধারিত হয়। কিন্তু বেশি সুদের কারণে শিল্প ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এমন কথা বলে সুদের হার বেঁধে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি। গত জুলাই মাসের শুরু থেকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ আর আমানতের ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় বিএবি।
