শুধু শোক নহে, শিক্ষা গ্রহণই অধিক জরুরি

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:১০

এই শোক এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিছুতেই থামানো যায় না হূদয়ের রক্তক্ষরণ। অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু আমেরিকাতেও হয়। মাত্র কয়েকমাস আগে ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল লণ্ডভণ্ড করিয়া দিয়াছে বিস্তীর্ণ এলাকা। কাড়িয়া লইয়াছে বহু মানুষের জীবন। কিন্তু সেই মৃত্যু আর গত বৃহস্পতিবার রাত্রে রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটিয়া যাওয়া মৃত্যু এক নহে। কারণ আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় যেইসকল দাবানলের কথা আমরা শুনি সেইগুলি সহজে প্রতিরোধযোগ্য নহে, কিন্তু চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে সেই কথা বলার অবকাশ কোথায়? সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা কমপক্ষে ৭৮ জন। এই সংখ্যা আরও বাড়িতে পারে। আহতদের অনেকের অবস্থা সংকটাপন্ন। জীবন্ত মানুষগুলি চোখের পলকে এমনভাবে দগ্ধ হইয়াছে—যাহা কল্পনা করিতেও হূদয় বিদীর্ণ হয়। কত পরিবার কত সুখস্বপ্ন যে তছনছ হইয়া গিয়াছে—তাহা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। কিন্তু যেই মৃত্যু যেই বিপর্যয় সহজেই প্রতিরোধযোগ্য—তাহার কোনো সান্ত্বনা নাই। এমনকী ইহাকে দুর্ঘটনা আখ্যায়িত করিয়া দায় বা দায়িত্ব এড়াইবারও কোনো সুযোগ নাই সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের। স্বজনহারানো শোকাহত সর্বস্বান্ত মানুষগুলিকে সমবেদনা জানাইবার ভাষাও আমাদের জানা নাই।

যদি এমন হইত যে সর্বপ্রকার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সত্ত্বেও একেবারেই আকস্মিকভাবে ঘটনাটি ঘটিয়া গিয়াছে—তবুও কিছুটা অন্তত সান্ত্বনা খুঁজিয়া পাওয়া যাইত। কিন্তু চুড়িহাট্টায় যাহা ঘটিয়া গিয়াছে— তাহাকে যদি একটি পূর্বঘোষিত বিপর্যয় বলিয়া অভিহিত করা হয় তাহা হইলে মোটেও অত্যুক্তি হইবে না। এই ধরনের বিপর্যয় যে অবধারিত ৮ বত্সর আগে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ড সুস্পষ্টভাবে সেই সতর্কবার্তা দিয়াছিল। ২০১০ সালের ৩ জুনের সেই অগ্নিযজ্ঞে বলি হইয়াছিল ১২৪টি তরতাজা জীবন। মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হইয়াছিল সমগ্র এলাকাটি। ঘিঞ্জি অলিগলির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গুদামজাত রাসায়নিকের ধ্বংসযজ্ঞ দেখিয়া শিহরিত হইয়াছিল সারা দেশের মানুষ। এই ধরনের জনপদে রাসায়নিকের ব্যবসা বা শিল্পকারখানা কতখানি বিপজ্জনক সংশ্লিষ্ট সকলেই তাহা চর্মচক্ষে প্রত্যক্ষ করিয়াছিল। কিন্তু কি ভুক্তভোগী জনগণ কি কর্তৃপক্ষ—কেহই কোনো প্রকার শিক্ষা গ্রহণ করে নাই। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার পর যথারীতি ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ হইয়াছিল। পুরান ঢাকার ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানার তালিকা করিয়া সেইগুলি কেরানীগঞ্জে সরাইয়া নেওয়ার উদ্যোগও  নিয়াছিল সরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটি আর হয় নাই। কেন হয় নাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই তাহা ভালো বলিতে পারিবেন।

ফলে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে। নিমতলীর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে চুড়িহাট্টায়। সেই একই চিত্র। গলি-ঘিঞ্জির গোলকধাঁধার ভিতরে অবস্থিত আবাসিক ভবনের মধ্যে রাসায়নিক এবং প্রসাধনী ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির মারাত্মক দাহ্য কাঁচামালের গুদাম, খাবারের হোটেল—সবই ছিল সেখানে! কেবল ছিল না দুর্যোগকালে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের কিংবা পানিসংগ্রহের ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা। ফলে দীর্ঘসময় ধরিয়া শুধু যে ভবনসমূহ পুড়িয়াছে তাহাই নহে, সংলগ্ন রাস্তায় তীব্র যানজটে অসহায়ভাবে আটকাইয়া পড়া ১৫-২০টি যানবাহনও পুড়িয়া ছাই হইয়া গিয়াছে তাহার চালক ও যাত্রীসমেত। নিমতলীর পর ইহা নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা; তবে শেষ সতর্কবার্তা অবশ্যই নহে। অনতিবিলম্বে যথাযথ শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হইলে যেকোনো সময়ে অপরিকল্পিত ও যথেচ্ছভাবে গড়িয়া উঠা এই রাজধানীর যেকোনো এলাকা চুড়িহাট্টায় পরিণত হইতে পারে।