বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সম্প্রতি জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কর্মীদের উপার্জিত অর্থের শতভাগ কিছু শর্তসাপেক্ষে দেশে পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আগেকার নিয়ম অনুযায়ী, এক জন বিদেশি কর্মী বাংলাদেশে যে আর্থিক সুবিধা পেতেন তার ৭৫ শতাংশ তাত্ক্ষণিকভাবে দেশে পাঠাতে পারতেন। উপার্জিত আয়ের অবশিষ্ট ২৫ শতাংশের মধ্যে বিধি মোতাবেক বিভিন্ন কর পরিশোধের পর যা বাকি থাকত তা স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করতে হতো। এই জমানো অর্থ তারা বাংলাদেশ থেকে ফিরে যাবার সময় নিয়ে যেতে পারতেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন বিদেশি কর্মী বাংলাদেশে অবস্থানকালে যে উপার্জন করবেন তার মধ্যে ৮০ শতাংশ তাত্ক্ষণিকভাবে তাদের দেশে পাঠাতে পারবেন। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ উপার্জন থেকে বিধি মোতাবেক স্থানীয় কর পরিশোধের পর, যা তার হাতে থাকবে, তাও নিজ দেশে পাঠাতে পারবেন। বিষয়টি এই রকম, আগে এক জন বিদেশি কর্মী যদি ১০০ টাকা আয় করতেন, তাহলে তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে ৭৫ টাকা নিজ দেশে প্রেরণ করতে পারতেন। অবশিষ্ট ২৫ টাকা থেকে স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত কর পরিশোধে যদি ১৫ টাকা ব্যয় হয়, তাহলে তার হাতে যে ১০ টাকা জমা থাকবে তা তিনি চাইলেই তাত্ক্ষণিকভাবে নিজ দেশে প্রেরণ করতে পারতেন না। এই ১০ টাকা বাংলাদেশেই সংরক্ষণ করতে হতো। সেই কর্মী যখন বাংলাদেশ থেকে চূড়ান্তভাবে চলে যেতেন, তখন এই টাকা নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারতেন।
সংশোধিত নতুন আইন অনুসারে একজন বিদেশি কর্মী যদি ১০০ টাকা আয় করেন, তাহলে তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে ৮০ টাকা দেশে পাঠাতে পারবেন। অবশিষ্ট ২০ টাকা থেকে ১০ টাকা ট্যাক্স পরিশোধের পর যে ১০ টাকা তার হাতে থাকবে, সেটাও তাত্ক্ষণিকভাবে কিছু শর্তসাপেক্ষে নিজ দেশে প্রেরণ করতে পারবেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কর্মীদের উপার্জিত অর্থ নিজ দেশে প্রেরণ অধিকতর সহজীকরণ করা হলো। এতে বাংলাদেশে বিদেশি কর্মীদের কাজের পরিবেশ অধিকতর অনুকূল হবে এবং বাংলাদেশে কাজের জন্য আসার ক্ষেত্রে আগ্রহ সৃষ্টি হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই নিয়ম প্রচলিত আছে, বিদেশি কর্মীরা যা আয় করবেন, তার একটি নির্দিষ্ট অংশ সেই দেশেই ব্যয় করতে হবে অথবা জমা রাখতে হবে। এটা করা হয় সাধারণত তাদের অর্থনীতিকে অধিকতর সচল করার জন্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে কেউ কেউ স্বাগত জানিয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিদেশিদের আয় নিজ দেশে পাঠানোর সুযোগ প্রদানের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করে বিদেশি কর্মী নিয়োগে নৈরাজ্য দূর করতে একটি সমন্বিত কৌশলগত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। ‘বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান : সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনের সূত্র ধরে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান।
তিনি আরেও বলেন, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের অনেকেই অবৈধভাবে কাজ করছেন। তাদের অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশই হুন্ডির মাধ্যমে দেশে প্রেরণ করছেন, যার পরিমাণ বার্ষিক ন্যূনতম ২৬ হাজার কোটি টাকা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে অবৈধভাবে কাজ করছেন, তারা তাদের উপার্জিত অর্থ হুন্ডিসহ নানা প্রক্রিয়ায় দেশে প্রেরণ করছেন। এছাড়া যারা বৈধভাবে কাজ করছেন, তাদের একটি অংশ নানাভাবে কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন অনৈতিক কৌশল অবলম্বন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগদাতারা বিদেশি কর্মীদের যে বেতন-ভাতা প্রদান করেন, তা প্রদর্শন না করে কর ফাঁকি দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত এবং দক্ষ কর্মীর অভাব থাকায় তারা দেশের বাইরে থেকে শ্রমশক্তি আনতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে যারা তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছেন, তারা প্রতি বছর ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ বৈধভাবে নিজ দেশে প্রেরণ করেন। হুন্ডির মাধ্যমে যে অর্থ নিজ দেশে প্রেরণ করা হয় তা বিবেচনায় নিলে এই অংশ বিশাল আকার ধারণ করবে। বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ‘সম্পদ নাকি দায়’ এটা বিশ্লেষণ ও নিরূপণ করার দাবি রাখে। বাংলাদেশ যেহেতু উপযুক্ত শ্রমশক্তির জোগান দিতে পারছে না, তাই উদ্যোক্তারা তাদের কারখানা পরিচালনার সুবিধার্থে বিদেশ থেকে শ্রমশক্তি নিয়ে আসেন। বাংলাদেশ প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে আহরণ করছে, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিরা নিয়ে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক এক সেমিনারে শীর্ষস্থানীয় বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের কয়েক জন জানিয়েছেন, তারা প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়ার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী পাচ্ছেন না। আবার উচ্চ শিক্ষিতরা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছেন না। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত একজন ছাত্র বা ছাত্রীর পক্ষে চাইলেই কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে আসীন হওয়া সম্ভব হয় না। কারণ তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগই আত্মঅহমিকাপূর্ণ শিক্ষিত বেকার তৈরির কারখানা মাত্র। বাংলাদেশে শিক্ষার পরিমাণ বেড়েছে; কিন্তু গুণমান বাড়েনি বরং আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ব্যাংককে হঠাৎ করে এমন আইনি সংস্কারের প্রয়োজন কেন হলো? এই নীতিগত পরিবর্তন আমাদের দেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা কি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে ভালোভাবে যাচাই করা হয়েছে? বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব বিদেশি কর্মী নিয়োজিত আছেন, তারা কী পরিমাণ অর্থ প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছেন, তার সঠিক হিসাব পাওয়া মুশকিল।
বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মীদের উপার্জিত পুরো আয় দেশে প্রেরণের ব্যাপারে যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে তা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এতে বিদেশ থেকে কর্মীদের বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের জন্য আগমনের হার বেড়ে যেতে পারে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নের বিরাট কর্মযজ্ঞ শুরু হতে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হচ্ছে। এসব বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত কারখানাগুলো যখন পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করবে তখন বিপুলসংখ্যক দক্ষকর্মীর প্রয়োজন হবে। বিদেশে উদ্যোক্তারা তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য নিয়ে আসবেন। বিদেশি উদ্যোক্তারা কিন্তু তাদের দেশ থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শ্রমশক্তি নিয়ে আসবে না। দক্ষ শ্রমশক্তি জোগান নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকেই। কিন্তু বাংলাদেশ সেই পর্যায়ে নেই। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনসংখ্যাধিক্য দেশ। কিন্তু আমাদের জনসংখ্যা দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত নয়। ফলে তারা দেশের উন্নয়নের জন্য সম্পদের পরিবর্তে দায় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বিনিয়োগের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই আমরা বাংলাদেশে সস্তায় পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়ার কথা বলি। কিন্তু অদক্ষ শ্রমিক, তা যত সস্তাই হোক না কেন, তা দিয়ে উৎপাদন নিশ্চিত করা যায় না। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো পুরো মাত্রায় উৎপাদন শুরু করলে সেখানে কয়েক কোটি দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। কিন্তু এই দক্ষ শ্রমিক আমরা কীভাবে জোগান দেব তা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। স্থানীয়ভাবে দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত শ্রমিকের জোগান নিশ্চিত না করা গেলে উদ্যোক্তারা বাইরের দেশ থেকে শ্রমশক্তি আমদানি করবেন। উপার্জিত আয়ের পুরোটা নিজ দেশে প্রেরণের সুযোগদান-সংবলিত বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সংশোধিত নীতিমালা বিদেশে শ্রমিক আমদানিকে উত্সাহিত ও সহজীকরণ করবে।
যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে যাত্রা শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমরা ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন করছি। কিন্তু সেই অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিতব্য শিল্পকারখানার শ্রমিক কোত্থেকে আসবে সে ব্যাপারে আমাদের তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে। কিন্তু তাদের কর্মপরিধি তেমন ব্যাপক নয়। সাধারণ মানুষ এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে তেমন একটা জানেন না। এখন রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তি পর্যায়ে পর্যাপ্তসংখ্যক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এমনকি যেসব বিদ্যালয়, কলেজ এবং বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষা দেওয়া হয়, তাদের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অপ্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি বিদেশে রপ্তানির চেয়ে তাদের স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে লাগানো যেতে পারে। জনশক্তি রপ্তানির চেয়ে অভ্যন্তরীণভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা অর্জন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ব্যাপকভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের কোনো বিকল্প নেই। দেশর বিপুলসংখ্যক যুব শক্তিকে বেকার রেখে বিদেশ থেকে কর্মী আমদানির মাধ্যমে কখনোই টেকসই উন্নয়ন সাধিত হতে পারে না।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড

