বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উত্পাদনশীল খাতে প্রবাসীদের বিনিয়োগের বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পায়নের স্বার্থে প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগে উত্সাহ প্রদান করা প্রয়োজন। প্রবাসীগণের উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। দেশে প্রবাসীদের উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে যে সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে সেটিকে কয়েকটি দিক থেকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসীদের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক অটুট থাকবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ইতিমধ্যেই প্রবাসীদের পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হ্রাস পেয়েছে। দেশে বিনিয়োগ, অর্থপ্রদান, যোগাযোগ ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রেই প্রবাসীদের পরবর্তী প্রজন্মের আগ্রহ হ্রাস পেয়েছে। তারা অনেকেই যে দেশে অবস্থান করছেন, সেখানেই ব্যবসায় বাণিজ্য, বাড়ি নির্মাণ অথবা ক্রয়, বিনিয়োগ ইত্যাদি করতে আগ্রহী। প্রবাসীগণকে উত্সাহ প্রদান এবং বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশে উপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করানো গেলে দেশের সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের সম্পর্ক অটুট থাকবে এবং বৃদ্ধি পাবে আশা করা যায়। এতে শক্তিশালী হবে দেশের অর্থনীতি। সুতরাং বাংলাদেশের স্বার্থে বিষয়টি বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, দেশে শিক্ষিত বেকার শ্রেণির কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশে বিপুলসংখ্যক কর্মহীন শিক্ষিত যুবক রয়েছেন। পড়ালেখা শেষ করে দীর্ঘদিন যাবৎ আশানুরূপ কর্মসংস্থান না হবার ফলে অনেকেই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। কয়েক জন ছাত্রের কাছে জানা গেল, বিগত ১২ বছরে সিলেট অঞ্চলের দুটি কলেজ থেকে চারটি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন। আরও জানা গেল, স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, ব্যাংকে চাকরি, ছোট-বড় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, বিদেশ গমন ইত্যাদি মিলে প্রায় ৫০ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রীর কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। শিক্ষিত বেকারের মধ্যে অনেকেই গ্রামে গিয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য শুরু করেছেন। অনেকেই দিয়েছেন মুদি দোকান, কাপড়ের দোকান, স্টুডিও ইত্যাদি। অনেকেই কম্পিউটার সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। অনেকেই মোটরসাইকেল শেয়ারিং করে আয়-উপার্জন করেন। কেউ কেউ গ্রাফিকসের কাজ করছেন, পার্টটাইম কাজ করছেন, টিউশনি করছেন। জানা গেল, অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে হোটেলে কাজ এবং গ্রামে গিয়ে ছোটখাটো কাজ করছেন। শিক্ষিত বেকার হয়ে গ্রামে ফিরে ছোটখাটো কাজ করলে অনেক ক্ষেত্রেই শুনতে হচ্ছে কটু কথা। এসবই হচ্ছে বাস্তবতা। প্রবাসীগণের মাধ্যমে উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব হলে অসহায় শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে ‘সিলেট অঞ্চলে প্রবাসী বিনিয়োগ :একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা’ নামক একটি গবেষণামূলক কার্যক্রমে গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত হবার সুযোগ হয়েছিল। গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে সিলেট অঞ্চলে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১২.৮৯৯.৫৫ কোটি টাকা এবং ১১,৩২৩ কোটি টাকা। এসব অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয় পারিবারিক ব্যয় নির্বাহে ও ভোগ বিলাসে এবং এর ফলে দ্রব্যমূল্য এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সিলেট অঞ্চলের ব্যাংকগুলোতে ঋণ আমানতের পরিমাণ মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাপ্ত আমানতের মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে। শিল্প ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ শতাংশ। গবেষণা রিপোর্টে ২০টি খাতকে সিলেট অঞ্চলে সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। খাতগুলো হলো আগর আতর শিল্প, সিরামিক শিল্প, রাবার শিল্প, কৃষিজাত শিল্প, পর্যটনশিল্প, কৃষি যন্ত্রপাতি উত্পাদনশীল শিল্প, ব্যাটারি ও টায়ার উত্পাদন, ইট উত্পাদন, প্লাস্টিক শিল্প, ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, জৈব সার কারখানা ইত্যাদি। রিপোর্টে প্রবাসী বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমিসংক্রান্ত সমস্যা, প্রারম্ভিক মূলধনের অভাব, অনুন্নত সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ, ঝুঁকিগ্রহণের অনীহা, শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার অভাব ইত্যাদিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি হিসেবে ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসে থাকেন। বাংলাদেশের স্বার্থেই সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসীগণের উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ এবং এর সফল বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন প্রায় ১৭ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। এছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রয়েছেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী। বাংলাদেশে উত্পাদনশীল খাতে বৃহৎ আকারে প্রবাসী বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ প্রবাসী বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের শিল্পে উন্নত বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রায় ১৮ লাখ প্রবাসী হাতে পারেন ‘টার্গেট গ্রুপ’। প্রবাসী বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনার জন্য সম্ভাব্য প্রবাসী বিনিয়োগকারীগণকে ‘সম্ভাব্য বৃহৎ বিনিয়োগকারী গ্রুপ’ এবং ‘সম্ভাব্য ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী গ্রুপ’ এই দুভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। পৃথিবীর যে কোনো দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীগণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী গ্রুপের অন্তভুর্ক্ত হতে পারেন। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী গ্রুপের প্রবাসীগণ কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধন সরবরাহ করতে পারেন।
প্রবাসী বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘সম্ভাব্য বৃহৎ বিনিয়োগকারী গ্রুপ’-এর বিষয়ে পর্যালোচনা হতে পারে। ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় চ্যানেল এস-এর চেয়ারম্যান জনাব আহমেদ উস-সামাদ চৌধুরী কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেল, ইংল্যান্ড প্রায় ১৩ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি আছেন, যারা ১০ কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ করতে সক্ষম। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুমান করা যায় আমেরিকাতে প্রায় ২৭ হাজার প্রবাসী আছেন যারা ১০ কোটির অধিক বিনিয়োগ করতে সক্ষম। ইউরোপের অন্যান্য দেশে এবং অস্ট্রেলিয়ায় ও জাপানে অবস্থান করছেন এবং ১০ কোটি টাকার অধিক বিনিয়োগ করতে সক্ষম এই সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার প্রবাসী। ধরি, প্রতি জন যদি কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। তাহলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হচ্ছে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লক্ষ কোটি টাকা। মোট বিনিয়োগযোগ্য অর্থের যদি কমপক্ষে ১০ শতাংশ বিনিয়োগ করাও সম্ভব হয়, তবে দেশে সম্ভাব্য বৃহৎ বিনিয়োগকারী গ্রুপের মাধ্যমে প্রায় ৪৪,০০০ কোটি টাকা প্রবাসী বিনিয়োগ সম্ভব। প্রবাসীরা যদি এ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেন তবে সন্দেহ নেই এতে উত্পাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা অনেকাংশে কমে আসবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য অঞ্চলভিত্তিক সম্ভাব্য বিনিয়োগের খাত শনাক্ত করা প্রয়োজন। বিভিন্ন অঞ্চলের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এতে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীগণ তাদের নিজ এলাকায় বিনিয়োগের আগ্রহী হন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সিলেট অঞ্চলের প্রবাসীগণ অনেক ক্ষেত্রে সিলেট অঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহী থাকেন। সিলেট শহরের বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণে এবং বিভিন্ন শপিং মল তৈরিতে ইতিমধ্যে প্রবাসীগণ কতৃর্ক প্রেরিত অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে।
বিদেশে অবস্থানরত সম্ভাব্য বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের শনাক্ত করা এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ প্রয়োজন। চেম্বার ও সরকারের উদ্যোগে বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে অবস্হানরত সম্ভাব্য বৃহৎ বিনিয়োগকারীগণের সঙ্গে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সম্ভাব্য বৃহত্ বিনিয়োগকারীগণের সঙ্গে সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ ও সংযোগ ঘটানো এবং রক্ষা করা। সম্ভাব্য উদ্যোক্তাগণ প্রবাসী বিনিয়োগের জন্য প্রবাসীদের অনুপ্রাণিত করতে পারেন। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে সফল উদ্যোগতাগণের তাদের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন ব্যবসায়ের উদ্যোগের জন্য প্রবাসী বিনিয়োগকারীগণকে উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উদ্যোক্তাগণের ভাবমূর্তি, বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের অপব্যবহার লক্ষ করা যায়। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় লক্ষ করা যায়। দেশে প্রবাসীদের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির জন্য নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির অভাব একটি সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীগণ বিশ্বস্ত ব্যক্তির অভাবে প্রতারিত হন। সিলেট শহরের কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথ্য নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশ বিদেশে অবস্হানরত অভিভাবক ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে পাঠানো অর্থ দিয়ে শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যয় মিটিয়ে থাকেন। প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো নিরসনের জন্য সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স, রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবহার এবং প্রবাসীগণের উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পিত উপায়ে রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবহার ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন সম্ভব।
লেখক : অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

