নিজের তৈরি চেনাছকে একটি তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান দীর্ঘদিন প্রচার হলে অনেকগুলো সংকট তৈরি হয়। এ সংকটের নাম প্রত্যাশার উর্ধ্বচাপ। কিন্তু সেই চাপকে ডিঙিয়ে ইত্যাদির প্রতিটি পর্বে তার দর্শকের চাহিদার প্রতি কোনোরকম অবিচার করেনি।
৩৪ বছরে পদার্পণ করল জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। গত ৩১ ডিসেম্বর বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে একযোগে প্রচারিত এবারের ইত্যাদির ছিল বরাবরের মতো নান্দনিক। এবারের পর্ব ধারণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া ডাকবাংলো চত্বরে।
প্রতিপর্বে নানান তথ্যে ঠাসা ইত্যাদি তাই নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্যও দেখতে হয়। এখনকার অনুষ্ঠান বা নাটক সবকিছুতেই অতিমাত্রার ভাঁড়ামি আর অশ্লীলতার ভিড়ে তারা যখন বলেন যে, ওসব ছাড়া নাকি দর্শকে খায় না। তাদেরকে বারবার হানিফ সংকেতের ইত্যাদি দেখানোটা জরুরী।
ইনফোটেইনমেন্ট কাকে বলে, তার সঠিক প্রয়োগ কিভাবে করতে হয়, তা অনেকেরই শেখা উচিত। যা নির্মল হাস্যরসের ভেতরে তুলে ধরেন এই মহীরুহ উপস্থাপক।
চমক লাগানো সাতবছর বয়সী শিশু সাদের বিরল মেধার পাশাপাশি ছেলেটির মোবাইল ফোনের যে উৎকৃষ্ট ব্যবহার দেখালো তার পরিবার। এই অংশটুকু দেখে আমার মনে হয় সারাদেশের এ বয়সী শিশুর বাবা-মা’র নতুন জাগরণ, নতুন চেষ্টা থাকবে, ঐ সাদের মতো করে তার সন্তানকেও তৈরি করার। ইত্যাদিকে তাই ঠিক একটি অনুষ্ঠান বলাটা অবিচার।
এই অনুষ্ঠানটিতে প্রতিটি মেসেজের মাধ্যমে উশকে দেয় নিজের মনোবৃত্তির সংশোধন। যেমন টক শে’র মাধ্যমে খুব দারুণভাবে জানান দিলের যে আমরা নিজেরা কিছু করতে পারি না অথচ অন্যের ভালোটা সহ্য হয় না। ইত্যাদিকেও মাঝে মাঝে যখন কিছু অথর্ব ছিদ্রান্বেষীরা সমালোচনা করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন, আর এগুলো যারা করেন তখন তাদের অর্জন খুঁজতে গেলে হতাশ হতে হয়। শুধু ইত্যাদি নয়। দেশের যে কোনো ভাল কিছুতে সহজে না মানার এক তীব্র ঈর্ষাকাতরতা দেখা যায় কারো কারো ভেতরে। তাদেরকেই চোখে আঙুল দিয়ে দারুণ মেসেজ দিলো ইত্যাদি।
এবারের পর্বের মাধ্যমেও জানা গেল না জানা অনেক কিছু। প্রথম সেনা সভা শেষে কর্নেল এমএজি ওসমানী গুলি ফুটিয়ে এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। এবারের অনুষ্ঠানে হবিগঞ্জ ও তেলিয়াপাড়া এবং এ জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর ওপর ছিল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন।
বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন ছিল হৃদয়ছোঁয়া। জীবনযুদ্ধে বিজয়ী সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সুজন কুমার বিশ্বাসের সফলতার গল্প দর্শকদের আবেগে আপ্লুত করেছে। কক্সবাজারের মো. ফরিদুল আলমের দোকান ‘আলাদীনের চেরাগ’-এর ওপর প্রচারিত প্রতিবেদনটি ছিল শিক্ষণীয়।
তবে ইংরেজি ফানি ডাব সিরিজগুলো যদি মাঝে মাঝে আবারও ফিরিয়ে আনতেন। দর্শক হিসেবে সেই চাওয়াটা রইল। ইত্যাদির প্রতি দর্শক প্রত্যাশার চাপ আছে ঠিকই। কিন্তু দর্শকের সস্তা চাওয়াগুলির প্রতি ইত্যাদির নজর নেই। এটাই ইত্যাদির সফলতার সবচেয়ে বড় অংক। কারণ দর্শকের খেয়ালী মনের বেখেয়ালি ইচ্ছা পূরণ করে তাৎক্ষনিক জনপ্রিয়তা পাবার জন্য লোভী থাকে না এই কালজয়ী অনুষ্ঠান।
