পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলী আর চকবাজারের চুড়িহাট্টার দূরত্ব দৃষ্টিসীমার মাঝেই। ৯ বছর পর চুড়িহাট্টা-ট্রাজেডি নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল নিমতলীর সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা। কেবল সময়ের ব্যবধান আছে, তবে পার্থক্য নেই আগুনের কার্যকারণ, দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে লেলিহান তান্ডব আর পরিণতির ক্ষেত্রে। প্রাণহানি এক করে দিয়েছে দুই জায়গা আর দুইটি সময়ের পার্থক্যকে। নিমতলীর ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হওয়ায় ক্ষোভে ফুসছেন অনেকেই। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে গণমাধ্যমে মানুষের বিস্ফোরক বক্তব্য উঠে আসছে। যারা বলছেন:নিমতলীর পর সতর্ক হলে হয়তো এতো মানুষকে আর প্রাণ দিতে হতো না এভাবে।
২০১০ সালের ৩ জুন রাত ৯টার দিকে নিমতলীর নবাব কাটরায় ৪৩ নম্বর বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য রান্না চলছিল। রান্নার পাশেই ছিল কেমিক্যালের গুদাম। চুলার তাপে কেমিক্যালের প্লাস্টিকের ড্রাম গলে আগুন ধরে যায়, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারের বিস্ফোরণ ঘটে। মুর্হুতেই পুরো এলাকায় কেমিক্যাল ছড়িয়ে পড়ে। কেমিক্যালের আগুনে বিয়ে বাড়ির একই পরিবারের এগারোজন, সামনের ৫৫ নম্বর বাড়ির ৬ জন এবং পাশের বাড়ির ৬ জনসহ সর্বমোট ১২৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পুড়ে যায় অসংখ্য বসতবাড়ি, দোকান ও কারখানা।
নিমতলীর দুর্ঘটনার পর সরকারের তদন্ত কমিটি জানিয়েছিল,বিয়ে বাড়ির রান্নার চুলা থেকে আগুনের শুরু এবং কেমিক্যালের গুদামের কারণে আগুন তীব্র হয়ে ওঠে। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনার পর তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে ওই পর্যন্তই। সিদ্ধান্ত আছে, বাস্তবায়ন হয়নি। সেই ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তার জন্য আবাসিক এলাকায় কারখানা স্থাপন বা রাসায়নিক পদার্থ রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও তা মানা হচ্ছে না। নিয়ম ভঙ্গ করে নবাব কাটরা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ব্যবসায়িরা আবাসিক এলাকার ভেতরেই অসংখ্য কারখানা গড়ে তুলেছেন। যার মধ্যে জুতার সলিউশন তৈরির আঠাসহ অন্যান্য দাহ্য পদার্থ রয়েছে। এ অবস্থায় অরক্ষিতভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নিমতলীর বাসিন্দারা সেখানে বসবাস করছেন। স্থানীয়রা বলছেন,নিমতলী থেকে রাসায়নিক পদার্থের কিছু গুদাম বা কারখানা সরে গেলেও সেগুলো বসানো হচ্ছে আশেপাশের আবাসিক এলাকাতেই। আগামসী লেন, কায়েতটুলি, সিদ্দিকবাজার, আলু বাজার, আরমানিটোলা এলাকা এখন রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। তাছাড়া নিমতলীতেও নতুন নতুন কারখানা, গুদাম গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন,পুরানো ঢাকার দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে বয়েছে, ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে রাসয়নিক দাহ্য পদার্থের কারখানা, রাসায়নিক মালামালের গুদাম ও দোকান, ঘিঞ্জি পরিবেশ,
নিয়ম বহির্ভূত নির্মাণ, জরুরি নির্গমন পথ বন্ধ বা একেবারেই না থাকা, অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র না থাকা, মাঝে মাঝে মহড়া না করা, সরু ও অপর্যাপ্ত সড়ক, সিড়ি, নিয়ম বহির্ভূত কারখানার ফ্লোর ব্যবহার করা, দুর্বল স্থাপনা। ঘিঞ্জি পরিবেশে একই ভবনে রয়েছে শিল্পকারখানা, রাসায়নিক দাহ্য পদার্থসহ বিভিন্ন মালামালের গুদাম ও দোকান এবং সেই সঙ্গে রয়েছে আবাসিক ফ্ল্যাটও। এছাড়া অলিতে-গলিতে রয়েছে রাসায়নিকের গুদাম, কারখানা ও দোকান এবং প্লাস্টিক ও পলিথিন কারখানা। এসব কারখানা, গুদাম, দোকানে আগুন নেভানোর নিজস্ব কোন ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনীয় রাস্তার অভাবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো দুর্ঘটনাস্থলে পৌছাতে পারে না। অনেক সময় কাছাকাছি জলাধার না থাকায় পানির অভাবে আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসকে বেগ পেতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীতে এরকম ঘটনা ঘটলে ঘটনার ভয়াবহতায় মানুষ হতবিহল হয়ে পড়েন। কিন্তু এক সময় দেখা যায়, সেই ঘটনার স্মৃতিতে ধুলোর আস্তর পড়ে। এমন বাস্তবতা এই সমাজে, এই লোকালয়ে। নিমতলীর ঘটনার পরও আমাদের টনক নড়েনি। এখনও কেমিক্যাল কারখানা অলিতে-গলিতে রয়ে গেছে। গতকাল তদন্ত কমিটি গঠনের পর সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে,চকবাজারের এই ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি হলো, তাদের প্রতিবেদনে পুরান ঢাকার মতো এই ঘিঞ্জি আর সরু রাস্তার এলাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে ফেলার সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকবে। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে। কারণ এদেশের বাস্তবতা তাই বলে। কেবল অনিরাপদ অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আতংকের মাঝে দিন কাটাবেন পুরানো ঢাকার নিমতলী- চুড়িহাট্টা বা অন্য এলাকার বাসিন্দারা।
