অণুগল্প

ফাগুনের বৃষ্টি

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৯:১২

—ফাগুনের বৃষ্টির মতো রোমান্টিক বৃষ্টি আর নাই।

আমার পাশে বসা লোকটি আনমনে কথাটি বললেন। দেখতে অনেকটা খ্যাপাটে। দুটো অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে দূরে বৃষ্টিতে ভিজছে। সেদিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন তিনি। রমনাপার্কের যে বেঞ্চিতে আমরা দুজন বসে আছি, তার ওপরে ছাতার মতো বিশাল ঝাকড়াগাছ। তাই ফাগুনের রোমান্টিক বৃষ্টি আমাদের স্পর্শ করতে পারছে না।

আমার বগলে দুটো বই। বই দুটো খ্যাপাটে লোকটি দেখলেন এক ঝলক।

—বই পড়েন? নাকি সাজিয়ে রাখেন?

—পড়িও না, সাজিয়েও রাখি না।

—তাহলে?

—তাহলে আর কী? আমার এক জাঁদরেল বন্ধুর দুটো বই বের হয়েছে বইমেলায়, ওর কাছে আমার একটা জরুরি কাজ আছে, তাই বই দুটো কিনলাম।

—খুব ভালো। বুনো ওলের জন্য বাঘা তেঁতুল-মার্কা বুদ্ধি দরকার। বই খুব কাজের জিনিস।

আমি প্রশ্নবোধক চোখে তাকালাম।

লোকটার চোখের দৃষ্টি অনেক দূরে চলে গেল। তিনি বলতে শুরু করলেন, আমার সমবয়সী এক কাজিন বোনের সুন্দরী বান্ধবী ছিল, নীপা। নীপার ছিল প্রচুর বই। মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, হুমায়ূন, সুনীল, শীর্ষেন্দু, সমরেশের নতুন নতুন বই—সে টাকা দিয়ে কিনে ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখত, পড়ত। নীপার সাথে ভাব জমাই বই ধার নেওয়ার অজুহাতে। ওর কাছ থেকে দুদিন পরপর চার-পাঁচটা করে বই নিয়ে আসতাম। নীপা মুখে না বললেও হাবেভাবে মনে হতো, ও ঠিক বিশ্বাস করতে পারত না আমি এত তাড়াতাড়ি বইগুলো পড়ে শেষ করছি। দু’সপ্তাহ না যেতেই নীপা একদিন হঠাত্ আমাকে দেওয়া বইগুলোর বিষয়বস্তু-কাহিনি নিয়ে ইন্টারভিউ শুরু করল।

—আপনি কি সত্যিই বইগুলো পড়তেন?

—পড়তাম তো অবশ্যই। ফ্ল্যাপ আর ভূমিকা পড়তাম। কষ্ট করে পুরো বই পড়ে কোন গাধায়? আমার কি কষ্টের দাম নাই?

—তা ঠিক। তা ইন্টারভিউতে কি পাস করলেন?

—কী বলছেন ভাই? সুনীলের কাহিনিসূত্র শীর্ষেন্দুর বই হিসেবে চালিয়ে দিতাম, হুমায়ূনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতাম সমরেশের, মাসুদ রানা আর তিন গোয়েন্দা মধ্যে কাহিনির গোঁজামিল লেগে যেত।

—মেয়েটা কি বুঝতে পারত?

—খুবই বিস্মিত হতো। ভাবত, আমি কী নিখুঁতভাবে পড়ি! আসলে ও নিজেই পড়ত না, বই কিনে সাজিয়ে রাখত শুধু। কিন্তু একদিন ধরা খেয়ে গেলাম। ও বলল, সৈকত তুমি খুব ভালো লেখক হতে পারবে।

—মানে কী?

—মানে আর কী। আমি বানিয়ে বানিয়ে বলতাম, এটা একদিন একটা বই পড়ে নীপা বুঝে ফেলল। তারপর থেকে আমি নীপার প্রেমে পড়ে যাই। কারণ, যা আমি পারিনি, তা ও করে ফেলেছে! পুরো একটা বই পড়ে ফেলেছে! কী ধৈর্য চিন্তা করা যায়!

—আর রোমান্টিক বৃষ্টি?

—সেদিন ছিল ফেব্রুয়ারির ২৯ তারিখ। লিপ-ইয়ার। ঢাকা থেকে বাসে করে ফরিদপুর ফিরেছি মাত্র। আকাশ কালো করে মেঘ করেছে। আমি ঝটপট একটা রিকশা ঠিক করি। ও খোদা! দেখি, ওই একই বাস থেকে নীপাও নামছে। কিন্তু আর রিকশা নাই। নীপাকে বললাম, তুমি এই রিকশা নিয়ে যাও, আমি পরে আসছি! আমি নেমে গেলাম। নীপা রিকশায় উঠল। একটু সরে বসল। বলল, তুমিও আসো। এমন রোমান্টিকভাবে বলল যে, আমার পেটের ভেতরে গুড়গুড় করে উঠল। আমাদের রিকশা গোরস্তানের কাছে আসতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। রিকশা থামিয়ে রিকশাওয়ালা দৌড়ে একটা ঝুপড়ি দোকানের নিচে দাঁড়াল। আমার পেটের মধ্যে আবার গুড়গুড় শুরু হলো। হুড নামানো। আমরা লেগে-লেপটে বসে আছি। আকাশ ভেঙে যেন বালতি বালতি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। আমরা কাকভেজা হয়ে গেলাম! তবুও হুড তুললাম না, লেগে-লেপটেই বসে থাকলাম। মনে হচ্ছিল, অনন্তকাল বৃষ্টি চলুক, নুহের বন্যা আসুক।

লোকটি এটুকু বলা শেষ করতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। এক দৌড়ে দূরের এক টংচায়ের দোকানের নিচে গিয়ে দাঁড়াল সে।

আমি ভিজতে থাকলাম একা-একা।